
দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মুঠোফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম অকেজো হচ্ছে। কিন্তু এসব বর্জ্য পরিবেশসম্মত ও আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি।
ফলে অন্যান্য গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গে ইলেকট্রনিক সরঞ্জামও ঠাঁই পাচ্ছে আস্তাকুঁড় বা ডাস্টবিনে। সিটি করপোরেশনগুলোর পক্ষ থেকেও এসব বর্জ্য আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে না। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও ব্যাটারির বর্জ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলেকট্রনিক সরঞ্জামে থাকা সিসা, সিলিকন, টিন, ক্যাডমিয়াম, পারদ, দস্তা, ক্রোমিয়াম ও নাইট্রাস অক্সাইডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক মাটি ও পানি দূষিত করছে। বিভিন্ন মাধ্যমে এসব বিষাক্ত উপাদান মানুষের শরীরে প্রবেশ করে নানা রোগের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ঝুঁকি বেশি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ শতাংশ হারে ই-বর্জ্য বাড়ছে। ২০৩৫ সাল নাগাদ বছরে ই-বর্জ্যের পরিমাণ ৪৬ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে।
২০১৮ সালের ওই প্রতিবেদনে দেশে বছরে প্রায় ৪ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপাদনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বা রিসাইক্লিং শিল্পে ব্যবহার করা হয়। বাকি ৯৭ শতাংশই ভাগাড়ে যাচ্ছে।
ই-বর্জ্যের প্রভাবে মানুষের বিভিন্ন টিস্যু, অঙ্গ ও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা বিষাক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে শ্বাসযন্ত্র, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, স্নায়ুতন্ত্র, মূত্রতন্ত্র ও প্রজনন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এতদিন মুঠোফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন কিংবা জাহাজভাঙা শিল্পের বর্জ্য নিয়ে বেশি আলোচনা হলেও এখন ঝুঁকির তালিকায় যুক্ত হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ খাত।
গত এক দশকে বাংলাদেশে সোলার হোম সিস্টেম, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং ব্যাটারিচালিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থার ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। এসব যন্ত্রের গড় আয়ুষ্কাল ১৫ থেকে ২৫ বছর। ফলে ধীরে ধীরে বিপুলসংখ্যক সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি মেয়াদোত্তীর্ণ হতে শুরু করেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ‘ক্রিস্টিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’-এর ক্লাইমেট সেন্টারের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশে স্থাপিত সোলার পিভি সেল থেকে অদূর ভবিষ্যতে প্রায় ৩৩ হাজার ২০৫ টন ই-বর্জ্য তৈরি হতে পারে।
সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকলে এই বর্জ্য থেকে ২৪ হাজার ৪৬৮ টন কাচ, ২ হাজার ৬৫৬ টন অ্যালুমিনিয়াম, ১ হাজার ৪০৪ টন সিলিকন এবং প্রায় ৫০ টন তামা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। তবে কার্যকর রিসাইক্লিং ব্যবস্থা না থাকায় এসব বর্জ্যে থাকা ভারী ধাতু বিপজ্জনক বিষে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যবহার বাড়ায় লিথিয়াম-আয়ন ও লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির বর্জ্যও দ্রুত বাড়ছে।
তবে এসব ব্যাটারি সংগ্রহ, পরিবহন ও পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানসম্মত নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন নেই। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো ব্যাটারি খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হচ্ছে কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে গলানো হচ্ছে।
এ ধরনের প্রক্রিয়ায় পরিবেশের পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
পরিবেশভিত্তিক বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ই-বর্জ্যের প্রায় ৯৭ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে প্রক্রিয়াজাত হয়।
পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা, শহরতলির স্ক্র্যাপ মার্কেট ও অস্থায়ী কারখানায় খোলা জায়গায় ই-বর্জ্য পুড়িয়ে, এসিড ব্যবহার করে কিংবা হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে মূল্যবান ধাতু আলাদা করা হয়। এতে এসব কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা সরাসরি বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসছেন।
রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, বর্তমানে ই-বর্জ্য আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে না। সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গেই এটি ব্যবস্থাপনা করা হয়।
তিনি জানান, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য দক্ষিণ সিটি করপোরেশন একটি কোরিয়ান কোম্পানির সঙ্গে রিসোর্স রিকভারি সেন্টার তৈরির চুক্তি করেছে।
প্রায় ৬০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি (এমআরএফ) প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্য পৃথক করে তা সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় প্লাস্টিক থেকে তেল, জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার এবং বায়োগ্যাস তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, চলতি মাস থেকেই প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
সম্পাদকঃ মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ রাইসা কবির, বার্তা সম্পাদক : সেলিম রানা, সাহিত্য সম্পাদকঃ সিদরাতুল ইসলাম সায়মা। Address: 169, Gha-1, Sahadat Hossain Road, West Dholaipar, Dhaka-1204. Gmail: dainikbishawsongbad@gmail.com Mobile:
ই পেপার