সরকারি প্রশাসন ও উন্নয়ন নীতিতে দক্ষতা, সমন্বয় ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানোর আলোচনা নতুন নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—নীতিগত আলোচনা যতই হোক, মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন সবসময় সমানভাবে দেখা যায় না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বৈঠকও সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে—বাংলাদেশ কি সত্যিই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে, যেখানে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে টেকসইভাবে তাল মেলানো সম্ভব?
বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মানবসম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া। অবকাঠামো উন্নয়ন একা যথেষ্ট নয়—এই উপলব্ধি এখন প্রায় সব উন্নয়ন অংশীদারের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। কারণ, আধুনিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় কেবল রাস্তাঘাট বা স্থাপনা নয়; দরকার দক্ষ আলোচক, নীতিনির্ধারক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন ও চুক্তি সম্পর্কে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন জনবল।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চলমান প্রকল্পগুলো মূলত সেই সক্ষমতা গড়ার দিকেই ইঙ্গিত করছে। ট্রেড নেগোসিয়েশন, ডব্লিউটিও বিধি, এবং বাণিজ্য আইন বিষয়ে দক্ষতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—এই প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে?
বাংলাদেশে বড় প্রকল্প ও উন্নয়ন কর্মসূচি নতুন কিছু নয়। সমস্যা বরং অন্য জায়গায়—প্রকল্প গ্রহণের গতি যত দ্রুত, বাস্তবায়ন ও দক্ষতা উন্নয়নের গতি তত ধীর। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো বারবারই দক্ষ জনবল ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতার ঘাটতির কথা তুলে ধরেছে, যা নতুন নয়, বরং দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—প্রকল্প পরিচালনা পর্যায়ের দক্ষতা। প্রকল্প পরিচালক বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্পের সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে দেয়। অথচ এই স্তরের দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা থাকলেও কার্যকর কাঠামো এখনো সীমিত।
অর্থনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু উৎপাদন বা রপ্তানির সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে নীতিগত দক্ষতা, আলোচনার ক্ষমতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ওপর। সেই জায়গায় দুর্বলতা থাকলে অবকাঠামোগত উন্নয়নও পুরোপুরি সুফল দিতে পারে না।
বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং ভ্যালু ক্রিয়েশনকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা মূলত দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকেই ইঙ্গিত করে। কিন্তু এসব উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে দেশীয় প্রশাসনিক কাঠামো কতটা দক্ষতার সঙ্গে এগুলো ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে পারে তার ওপর।
সব মিলিয়ে এই বৈঠক নতুন কোনো নীতিগত ঘোষণা না দিলেও একটি পুরোনো বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনেছে—বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় চ্যালেঞ্জ এখন আর কেবল অর্থ বা প্রকল্পের নয়, বরং দক্ষতা, সমন্বয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার। এই জায়গাগুলো শক্তিশালী না হলে উন্নয়নের গতি থাকবে, কিন্তু গুণগত পরিবর্তন হয়তো অধরাই থেকে যাবে।
সম্পাদকঃ মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ রাইসা কবির, বার্তা সম্পাদক : সেলিম রানা, সাহিত্য সম্পাদকঃ সিদরাতুল ইসলাম সায়মা। Address: 169, Gha-1, Sahadat Hossain Road, West Dholaipar, Dhaka-1204. Gmail: dainikbishawsongbad@gmail.com Mobile:
ই পেপার