“ভূমি পুনরুদ্ধার, মরুকরণ প্রতিরোধ এবং খরা-সহনশীলতা বৃদ্ধি”— এই প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হয়েছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকটময় সময়ে প্রতিপাদ্যটি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান। কারণ ভূমি, বন, পানি ও জীববৈচিত্র্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। একটি বন ধ্বংস হলে শুধু কয়েকটি গাছ নয়, হারিয়ে যায় একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস এলেই দেশে গাছ লাগানোর নানা কর্মসূচি দেখা যায়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন—সবাই অংশ নেয় বৃক্ষরোপণে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় হাজার হাজার চারা রোপণের খবর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব চারার কতগুলো শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে?
গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর বৃক্ষআচ্ছাদন হারিয়েছে। শুধু ২০২৫ সালেই হারিয়েছে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর প্রাকৃতিক বনভূমি। বর্তমানে দেশের মোট ভূমির মাত্র ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ বনভূমির আওতায় রয়েছে। অর্থাৎ একদিকে গাছ লাগানো হচ্ছে, অন্যদিকে আরও দ্রুত গতিতে হারিয়ে যাচ্ছে গাছ।
এই বৈপরীত্যের অন্যতম কারণ হলো আমরা গাছ লাগানোকে অনুষ্ঠান হিসেবে দেখি, কিন্তু গাছ বাঁচিয়ে রাখাকে দায়িত্ব হিসেবে দেখি না। একটি চারা রোপণ দৃশ্যমান ও প্রচারযোগ্য হলেও, বছরের পর বছর পরিচর্যার বিষয়টি প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যায়। ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই অনেক চারা মারা যায় বা নষ্ট হয়ে যায়।
প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রায়ই উল্লেখ থাকে কত গাছ লাগানো হয়েছে। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই বলা হয়, কয়েক বছর পর তার কতগুলো জীবিত রয়েছে। অথচ প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত গাছের বেঁচে থাকার হার।
একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ শুধু কার্বন শোষণই করে না; এটি অক্সিজেন সরবরাহ করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, মাটি রক্ষা করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। ফলে যে চারা টিকেই থাকল না, তার পরিবেশগত অবদানও সীমিত।
রাজধানী ঢাকায় গত এক দশকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও একই হারে বাড়েনি সবুজায়ন। কংক্রিটের বিস্তার বেড়েছে, কমেছে উন্মুক্ত সবুজ জায়গা। এর ফলে নগর তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ এবং হিট আইল্যান্ড প্রভাব আরও তীব্র হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী শহরে মাথাপিছু যে পরিমাণ সবুজ খোলা জায়গা থাকা প্রয়োজন, ঢাকা তার অনেক নিচে অবস্থান করছে। এর প্রভাব হিসেবে নগরবাসীকে প্রতিনিয়ত গরম, ধুলাবালি ও দূষিত বাতাসের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে।
গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য উপযোগী গাছ পার্বত্য এলাকায় কার্যকর নাও হতে পারে। আবার শহুরে এলাকায় প্রয়োজন ছায়াদানকারী ও দূষণ-সহনশীল গাছ। তাই শুধু সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে সঠিক স্থানে সঠিক গাছ লাগানো জরুরি।
বিশ্বের অনেক দেশে বৃক্ষরোপণ প্রকল্পের সাফল্য মূল্যায়ন করা হয় ‘সারভাইভাল রেট’ বা বেঁচে থাকার হার দিয়ে। বাংলাদেশেও একই পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। কত গাছ লাগানো হলো, তার পাশাপাশি কত গাছ টিকে রইল—সেই তথ্যও প্রকাশ করা উচিত।
বিদ্যালয়ভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। একজন শিক্ষার্থীকে শুধু গাছ লাগানোর দায়িত্ব নয়, বরং কয়েক বছর ধরে গাছটির পরিচর্যার দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রকৃতির সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক তৈরি হবে।
পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; নাগরিকদেরও। নিজের আশপাশের গাছের যত্ন নেওয়া, প্রয়োজন হলে পানি দেওয়া এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা করা—এসব ছোট উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
প্রকৃতি প্রচারণা বোঝে না; বোঝে ফলাফল। কত অনুষ্ঠান হলো বা কত ছবি তোলা হলো, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি গাছ সত্যিই বড় হলো কি না, তার ছায়ায় মানুষ আশ্রয় পেল কি না, কিংবা সেটি পরিবেশকে কতটা উপকার করল।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য গাছ শুধু সৌন্দর্যের উপাদান নয়; এটি পরিবেশ সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।
তাই সময় এসেছে গাছ লাগানোর সংখ্যা নয়, গাছ বাঁচিয়ে রাখার সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়ার। একটি চারা রোপণ এক দিনের কাজ, কিন্তু একটি বন তৈরি হয় দীর্ঘ সময়ের যত্ন, পরিকল্পনা ও দায়বদ্ধতার মাধ্যমে।
সম্পাদকঃ মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ রাইসা কবির, বার্তা সম্পাদক : সেলিম রানা, সাহিত্য সম্পাদকঃ সিদরাতুল ইসলাম সায়মা। Address: 169, Gha-1, Sahadat Hossain Road, West Dholaipar, Dhaka-1204. Gmail: dainikbishawsongbad@gmail.com Mobile:
ই পেপার