
বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব শৈশব থেকেই। সেই ভালোবাসা আর দীর্ঘ কয়েক দশকের সংগ্রহে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এক ব্যক্তিগত গ্রন্থভাণ্ডার। সাবেক সংসদ সদস্য ও বরেণ্য শিক্ষাবিদ আ ন ম শামছুল ইসলামের বাড়ির প্রায় প্রতিটি কক্ষজুড়েই এখন বই আর বই।
এলাকায় ‘নাসের প্রফেসর’ নামে পরিচিত এই শিক্ষাবিদের সংগ্রহে রয়েছে অসংখ্য বিরল, দুষ্প্রাপ্য ও ব্যতিক্রমধর্মী বই। সব মিলিয়ে ব্যক্তিগত এই সংগ্রহের আনুমানিক মূল্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা।
আ ন ম শামছুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই বই সংগ্রহের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই বই কেনা শুরু করেন তিনি।
তবে শুধু পড়ার জন্য বই কেনাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। বিরল ও দুষ্প্রাপ্য বই খুঁজে বের করে সংগ্রহ করাই ধীরে ধীরে তাঁর অন্যতম নেশায় পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে সেই সংগ্রহই বিশাল ব্যক্তিগত গ্রন্থভাণ্ডারে রূপ নিয়েছে।
১৯৬৮ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত রামগঞ্জ সরকারি কলেজে অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আ ন ম শামছুল ইসলাম। পরে ১৯৯৪ সালের ২২ আগস্ট রামগঞ্জ দল্টা কলেজে যোগ দিয়ে ১ সেপ্টেম্বর অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন। প্রায় ১০ বছর অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনের পর এক সিনিয়র শিক্ষকের কাছে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব হস্তান্তর করে অবসরে যান।
রামগঞ্জ সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করার সময় তাঁর বই সংগ্রহের আগ্রহ আরও বাড়ে। প্রতিবছর শিক্ষা বোর্ডের পরিদর্শক দল কলেজ পরিদর্শনে আসত। তখন কলেজের সমৃদ্ধ লাইব্রেরি তুলে ধরতে বিভিন্ন শিক্ষকের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বই এনে সেখানে সাজিয়ে রাখা হতো।
কলেজের মান ও শিক্ষার পরিবেশ ধরে রাখার তাগিদ থেকেই তখন বই সংগ্রহের বিষয়ে আরও মনোযোগী হন বলে জানান তিনি।
শিক্ষকতার পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন আ ন ম শামছুল ইসলাম। ১৯৮৫ সালে তিনি রামগঞ্জ উপজেলার প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
এর পর ১৯৮৬ সালের ৭ মে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রামগঞ্জ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে তিনি স্বাধীনতা-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ের প্রথম এমপি আব্দুর রশিদকে পরাজিত করেন। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে রামগঞ্জের দ্বিতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
শিক্ষার প্রতি তাঁর অনুরাগের ছাপ রয়েছে পরিবারেও। তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলে। দুই মেয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।
বড় মেয়ে বর্তমানে পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। ছোট মেয়ে ঢাকার একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। বর্তমানে অধ্যাপক শামছুল ইসলাম ছোট মেয়ের সঙ্গেই থাকেন।
তাঁর একমাত্র ছেলে যুক্তরাজ্যে এমবিএ সম্পন্ন করে সেখানেই পরিবার নিয়ে স্থায়ী হয়েছেন এবং ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়েছেন।
আ ন ম শামছুল ইসলামের স্ত্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। অবসর গ্রহণের পর ২০২০ সালে তিনি মারা যান।
বর্তমান প্রজন্মের বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন এই শিক্ষাবিদ।
তিনি বলেন, এখন পড়ালেখা নেই, শুধু রাজনীতি। দেশ ও জাতির মৌলিক সমস্যা কোথায়, তা খুঁজে দেখার লোকও কমে গেছে।
তরুণ প্রজন্ম মোবাইল ও ডিজিটাল আসক্তিতে ডুবে যাচ্ছে বলেও আক্ষেপ করেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, তারা পড়বে কখন? বই পড়ার সময়ই যখন নেই, তখন বই কেনা বা সংগ্রহ করার আগ্রহ তৈরি হবে কীভাবে?
কয়েক দশকের অধ্যয়ন, বই সংগ্রহ ও জ্ঞানপিপাসার ফসল হিসেবে গড়ে ওঠা আ ন ম শামছুল ইসলামের এই ব্যক্তিগত গ্রন্থভাণ্ডার এখন শুধু তাঁর পরিবারের সম্পদ নয়।
রামগঞ্জের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসেও এটি একটি অনন্য নিদর্শন হয়ে উঠেছে।
সম্পাদকঃ মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ রাইসা কবির, বার্তা সম্পাদক : সেলিম রানা, সাহিত্য সম্পাদকঃ সিদরাতুল ইসলাম সায়মা। Address: 169, Gha-1, Sahadat Hossain Road, West Dholaipar, Dhaka-1204. Gmail: dainikbishawsongbad@gmail.com Mobile:
ই পেপার