
রাজধানীর ফুটপাত ও সরকারি জমি দখলমুক্ত করার অভিযানে বারবার সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) মিরপুর-১০ এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সিটি করপোরেশনের গাড়িতে আগুন, পুলিশের গাড়ি ও উচ্ছেদযন্ত্র ভাঙচুর এবং সাংবাদিক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
গত ছয় মাসে রাজধানীর অন্তত পাঁচটি ঘটনায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনাকারী পুলিশ ও প্রশাসনের সদস্যরা বাধা বা হামলার মুখে পড়েছেন। এসব ঘটনায় একদিকে অভিযানের প্রস্তুতি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে উচ্ছেদের পর পুনর্দখল ঠেকানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে।
বুধবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে মিরপুর-১০ গোলচত্বর থেকে মিরপুর-১৪ পর্যন্ত সড়কে অবৈধ দোকানপাট ও হকার উচ্ছেদে যৌথ অভিযান শুরু করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও পুলিশ।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হোপ মার্কেটের সামনে অভিযান চলার সময় আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দোকান ভাঙার সময় বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগে। এতে বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদের নিচে থাকা কয়েকটি দোকান পুড়ে যায়।
এরপর হকার ও ব্যবসায়ীদের একাংশের সঙ্গে অভিযান পরিচালনাকারীদের উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তারা লাঠিসোটা ও ইটপাটকেল নিয়ে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।
একপর্যায়ে সিটি করপোরেশনের তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের একটি পিকআপ ও উচ্ছেদ অভিযানে ব্যবহৃত একটি এক্সকাভেটর। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের গাড়িও ভাঙচুর করা হয়।
সংঘর্ষের মধ্যে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে আহত হন এক সংবাদকর্মী। পরে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
পরে অতিরিক্ত পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ও আনসার সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। বেলা আড়াইটার দিকে আবার উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে ডিএনসিসি।
মিরপুরের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এর আগে মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত যাত্রাবাড়ী, পল্লবী, গেন্ডারিয়া ও জুরাইনে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে পুলিশ ও প্রশাসনের সদস্যদের বাধা, হামলা ও যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
৭ মার্চ যাত্রাবাড়ী: ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযানে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে দুজনকে আটক করা হয়। পরে আদালত তাদের কারাদণ্ড দেন।
২০ মে পল্লবী: বাউনিয়াবাঁধ এলাকায় সরকারি জমি উদ্ধারে গিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সদস্যরা স্থানীয়দের হামলার মুখে পড়েন। এতে অন্তত সাত পুলিশ সদস্য আহত হন। পুলিশের জন্য রিকুইজিশন করা কয়েকটি বাসও ভাঙচুর করা হয়।
৮ জুন গেন্ডারিয়া: ডিআইটি পুকুরপাড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে শ্যামপুর থানার ওসি ও তাঁর দেহরক্ষী আহত হন।
২৬ জুলাই জুরাইন: সড়ক দখলমুক্ত করতে গিয়ে কদমতলী থানার পুলিশ দল হামলার মুখে পড়ে। এ সময় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরে দুজনকে আটক করা হয়।
স্থান ও পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও এসব ঘটনায় সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় বাধা বা হামলার বিষয়টি সামনে এসেছে।
মিরপুরের ঘটনার পর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ করেননি।
অন্যদিকে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত রাখা এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন বলেন, বিভিন্ন অভিযানে পুলিশ আইনের মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করে। উচ্ছেদের সময় কিছু গোষ্ঠী পুলিশের ওপর হামলা চালাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং দায়িত্ব পালনের সময় মামলা বা আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলছে। তবে এ দাবির ব্যাপকতা ও প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে স্বাধীন মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান নতুন নয়। তবে উচ্ছেদের পর একই জায়গা আবার দখল হওয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। ফলে শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা নয়, দখলমুক্ত জায়গা স্থায়ীভাবে ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।
ফুটপাতের ছোট ব্যবসা ও হকারির সঙ্গে বহু মানুষের জীবিকা জড়িত। অন্যদিকে ফুটপাত দখল হয়ে গেলে পথচারীদের সড়কে চলতে হয়, যা যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
এ কারণে উচ্ছেদের পাশাপাশি বৈধ বিকল্প ব্যবস্থা, নির্ধারিত বাণিজ্যিক স্থান এবং পুনর্বাসনের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ডিএনসিসি প্রশাসক জানিয়েছেন, দখলমুক্ত জায়গাগুলোকে নাগরিকবান্ধব করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। মিরপুর-১০ গোলচত্বরের ফুট ওভারব্রিজের নিচে উচ্ছেদের পর গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
মিরপুরের ঘটনার পর ডিএনসিসির সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং সংঘাত এড়িয়ে সেই অবস্থা ধরে রাখা।
একটি উচ্ছেদ অভিযানের সাফল্য শুধু কতটি দোকান বা স্থাপনা সরানো হয়েছে, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উচ্ছেদের পর ফুটপাত কতদিন পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখা যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মিরপুরের সংঘর্ষ রাজধানীর ফুটপাত ব্যবস্থাপনা, হকারদের জীবিকা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের জটিলতাগুলোকে আবারও সামনে এনেছে। এখন বড় প্রশ্ন—দখলমুক্ত করার পর ফুটপাত কতটা স্থায়ীভাবে নগরবাসীর চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা সম্ভব হবে।
সম্পাদকঃ মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ রাইসা কবির, বার্তা সম্পাদক : সেলিম রানা, সাহিত্য সম্পাদকঃ সিদরাতুল ইসলাম সায়মা। Address: 169, Gha-1, Sahadat Hossain Road, West Dholaipar, Dhaka-1204. Gmail: dainikbishawsongbad@gmail.com Mobile:
ই পেপার