
স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন সংকটের দায় এককভাবে চিকিৎসকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের আইসিইউ ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. আসিফ সৈকত। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সামনে এক চিকিৎসককে প্রকাশ্যে ভর্ৎসনা করার ঘটনাকে তিনি ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, এতে সমস্যার মূল কারণ আড়াল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে ডা. আসিফ সৈকত স্বাস্থ্যব্যবস্থায় দায়িত্ব বণ্টন ও জবাবদিহির কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
ডা. আসিফ সৈকতের প্রশ্ন, কোনো হাসপাতালের প্যাথলজি সেবা সচল রাখা কি কেবল ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করা চিকিৎসকের কাজ?
তিনি বলেন, একটি হাসপাতালে প্যাথলজি বিভাগ, হাসপাতাল প্রশাসন, প্রকিউরমেন্ট, স্টোর, রিএজেন্ট সরবরাহ ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগ থাকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য। চিকিৎসকের মূল দায়িত্ব রোগী দেখা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা দেওয়া।
তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট না থাকা, ল্যাবের যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকা কিংবা জনবল সংকটের মতো বিষয়গুলোর দায় নির্ধারণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও সরবরাহ ব্যবস্থার দিকটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একজন সংকটাপন্ন রোগীর জরুরি ভিত্তিতে সিরাম ইলেকট্রোলাইট পরীক্ষার প্রয়োজন হলো, কিন্তু হাসপাতালে সেই পরীক্ষা করা যাচ্ছে না—এমন পরিস্থিতির উদাহরণ তুলে ধরেন ডা. আসিফ সৈকত।
তাঁর প্রশ্ন, এ অবস্থায় চিকিৎসক কি পরীক্ষা ছাড়াই চিকিৎসা শুরু করবেন? নাকি অন্য কোথাও পরীক্ষা করিয়ে রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করবেন?
তিনি মনে করেন, এমন পরিস্থিতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত—কেন হাসপাতালে মৌলিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ রয়েছে, রিএজেন্ট সরবরাহে সমস্যা কোথায়, কতদিন ধরে এ সংকট চলছে এবং এর জন্য দায়ী কে।
ডা. আসিফ সৈকতের মতে, ল্যাবে জনবল সংকট থাকলে নিয়োগ বা সংযুক্তির ব্যবস্থা কেন হয়নি, যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকলে সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ কেন করা হয়নি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো অনিয়ম বা সিন্ডিকেট রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও তদন্ত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এসব প্রশ্ন ক্যামেরার সামনে তুললে হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে আলোচনার উত্তাপ কম হতে পারে, কিন্তু স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে এর গুরুত্ব অনেক বেশি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে ডা. আসিফ সৈকত বলেন, কোনো সমস্যার দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
তাঁর ভাষ্য, প্রকিউরমেন্ট, হাসপাতাল প্রশাসন, সাপ্লাই চেইন এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যর্থতার বিষয়টিও পর্যালোচনা করা দরকার।
তিনি মনে করেন, একজন চিকিৎসককে জনসম্মুখে ভর্ৎসনা করার চেয়ে যে কাঠামোগত সমস্যার কারণে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রোগীকে চিকিৎসা দিতে বাধ্য হচ্ছেন, সেটি সমাধানে জোর দেওয়া বেশি কার্যকর।
ডা. আসিফ সৈকত বলেন, ক্যামেরার সামনে একজন চিকিৎসককে দায়ী করার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের পুরো ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব বণ্টন পর্যালোচনা করা উচিত।
তাঁর বক্তব্য, ‘Doctor shaming নয়, System auditing করুন। Camera accountability নয়, Institutional accountability নিশ্চিত করুন।’
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকটের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত না করে শুধু চিকিৎসককে দায়ী করা হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বরং প্রতিবার একই ধরনের পরিস্থিতিতে নতুন করে কোনো চিকিৎসককে জনসম্মুখে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
ডা. আসিফ সৈকত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের আইসিইউ ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট।
সম্পাদকঃ মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ রাইসা কবির, বার্তা সম্পাদক : সেলিম রানা, সাহিত্য সম্পাদকঃ সিদরাতুল ইসলাম সায়মা। Address: 169, Gha-1, Sahadat Hossain Road, West Dholaipar, Dhaka-1204. Gmail: dainikbishawsongbad@gmail.com Mobile:
ই পেপার