
কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পর্দার আড়ালে যোগাযোগ অব্যাহত; হরমুজ প্রণালি নিয়ে মতপার্থক্য এখনো কাটেনি
টানা তৃতীয় দিনের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমেছে। এই পরিস্থিতিতে দুই দেশকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে কাতার ও পাকিস্তান সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো শান্তি আলোচনা শুরু হয়নি, তবে উভয় পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পর্দার আড়ালে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর বরাত দিয়ে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে কাতার ও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে প্রায় দুই সপ্তাহের টানা উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা আপাতত বন্ধ থাকায় কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে।
ট্রাম্পের দাবি, ইরানের অস্বীকৃতি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমরা ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি এবং আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে।”
তবে একইসঙ্গে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, আলোচনায় অগ্রগতি না হলে ইরানকে কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের এ দাবি সরাসরি নাকচ করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে শান্তি আলোচনার কোনো অনুরোধ ইরান জানায়নি। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উত্তেজনার সূত্রপাত
চলতি মাসের শুরুতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলীয় এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ধারাবাহিক বিমান হামলা চালায়। পরে গত শনিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই হামলা সাময়িকভাবে স্থগিতের নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এসব হামলায় জর্ডানে তিনজন এবং ইরাকে একজন মার্কিন সেনা নিহত হন বলে জানা গেছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে অচলাবস্থা
সম্ভাব্য সমঝোতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে রয়েছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিয়ম। ইরান চায়, আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো তাদের উপকূলসংলগ্ন নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার করুক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো এ দাবির বিরোধিতা করছে।
অচলাবস্থা নিরসনে ওমান একটি সমঝোতা প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী দেশগুলো স্বেচ্ছায় নির্ধারিত টোল পরিশোধ করবে। তবে ইরানের অবস্থান, এই টোল বাধ্যতামূলক হতে হবে। এ বিষয়েই এখনো দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
মধ্যস্থতাকারীদের তৎপরতা অব্যাহত
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, কাতার, পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতাকারীরা এখনো দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদান করছেন। তাদের লক্ষ্য, জুন মাসে হওয়া সমঝোতা স্মারককে পুনরুজ্জীবিত করে সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করা।
তবে যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত বলে মনে করছে তেহরান। ইরানের দাবি, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির ব্যবহার নিয়ে নতুন কোনো কাঠামো ও টোল ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে।
নিরাপত্তা জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র
এদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী অন্তত ১৭টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে। পাশাপাশি দুটি জাহাজের কার্যক্রম বন্ধ করে আরও দুটি জাহাজে তল্লাশি চালানো হয়েছে, যাতে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ কার্যকর রাখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক সংঘাতে আপাত বিরতি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও হরমুজ প্রণালি, নৌ চলাচল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে গভীর মতপার্থক্য দূর না হলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের স্থায়ী সমাধান এখনো অনিশ্চিতই থেকে যাবে।
প্রতিবেদকের নাম 



















