ঢাকা ১১:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
দুই ছেলের নামে দুই ইউনিয়নের নামকরণ, সংসদে দেওয়া ব্যাখ্যায় যা বললেন প্রতিমন্ত্রী ঢাকার চারটি বাস টার্মিনাল অতিদ্রুত স্থানান্তরে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি আমাদের জন্য ক্ষতিকর: ইসরাইলি অর্থমন্ত্রী সমর্থকদের মাঠে প্রবেশ না করতে দেওয়ার অনুরোধ করেছে আর্জেন্টিনা সরকার পুশ ইন করা সেই বৃদ্ধকে ভারতে নিয়ে গেছে বিএসএফ দুই নায়িকা নিয়ে ব্যাংকক যাচ্ছেন শাকিব খান দিল্লিতে ডা. জাহেদের সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব প্রিয় দলের জার্সি পরে খেলা দেখায় কেন বাড়ে আবেগ? লিবিয়া হয়ে অবৈধ প্রবেশে কড়াকড়ি, সতর্ক করল ইতালি দূতাবাস গাইবান্ধার হত্যা মামলার প্রধান আসামি রংপুরে গ্রেফতার
বিজ্ঞাপন:
📰 Dainikbishawsongbad.com— দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ খবর, ব্রেকিং নিউজ, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন, আন্তর্জাতিক সংবাদ ও গুরুত্বপূর্ণ সকল আপডেট পেতে প্রতিদিন ভিজিট করুন 🌍 নির্ভরযোগ্য ও দ্রুত সংবাদ পরিবেশনে আমরা সবসময় আপনার পাশে। 📢 আপনার ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য ব্যানার বিজ্ঞাপন ও স্পন্সর পোস্ট সুবিধা রয়েছে। 🌐 DainikBishwaSongbad.com

সজল মেঘের ভেলায় চড়ে এলো বর্ষার দিন

আনোয়ার আলদীন


আকাশে সজল সঘন মেঘের ভেলা, বাতাসে সোঁদা মাটির গন্ধ আর দূরে কোথাও নিঃসঙ্গতার মুদ্রায় বৃষ্টির ধূমল শব্দ—বর্ষা তার আগমনী বার্তা আগেই পৌঁছে দিয়েছে প্রকৃতির বুকে। ‘আকাশে আষাঢ় এলো; বাংলাদেশ বর্ষায় বিহ্বল/ মেঘবর্ণ মেঘনার তীরে তীরে নারকেলসারি/ বৃষ্টিতে ধূমল’—বুদ্ধদেব বসুর এই কবিতার নিটোল, সজল ও নিবিড় প্রকৃতির লাবণ্যে যেন জ্যৈষ্ঠের মধুর দহনকালের যবনিকা নেমে আসে। বাংলাদেশ পা রাখে বর্ষার বৃষ্টি-ধূমল চৌকাঠে। বাংলার প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের পিঙ্গল জটা ভেদ করে জীমূত-মন্দ্রে বর্ষার এলো আষাঢ়। কবি বলেছেন, ‘বজ্র মানিক দিয়ে গাঁথা আষাঢ় তোমার মালা।’

প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের রুদ্র দহন ছিন্ন করে বর্ষার দিন আসে। আষাঢ়ে জলভারানত ঘন কৃষ্ণ মেঘরাশির ওপর ভর করে বিরাট দৈত্যের মতো প্রকৃতিতে নামে বর্ষা। মেঘের গুরুগুরু গর্জনে বেজে ওঠে তার আগমনী। তৃষ্ণায় কাতর শস্যক্ষেত, বৃক্ষরাজি, লতাগুল্ম ও প্রাণীকুল অঝোর বর্ষণে ফিরে পায় প্রাণের গভীর স্পন্দন। বৈষ্ণব কবির ভাষায়—‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে মেঘমাশ্লিষ্ট সানুং’। পঞ্জিকার অনুশাসনে আজ আষাঢ়ের পয়লা দিন।

বর্ষায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাউল হৃদয় ময়ূরের মতো নেচে উঠত। তিনি গেয়েছেন, ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে, ময়ূরের মতো নাচেরে…।’ আবার—‘ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে/ জল সিঞ্চিচ ক্ষিতি সৌরভ রভসে/ ঘন গৌরবে নবযৌবনা বরষা।’ আষাঢ়ে প্রকৃতি ‘সজল শ্যাম ঘন দেওয়া’কে সাদর সম্ভাষণ জানায়, আর সর্বত্র ছড়িয়ে দেয় অনুপম সুরধ্বনির অনুরণন। প্রকৃতি, মানুষ ও সব প্রাণী যেন আগমনী গান গেয়ে বরণ করে নেয় নবীনা বর্ষার শ্যামগম্ভীর সরস রূপকে। ‘বারিধারে এসো চারিধার ভাসায়ে, বিদ্যুৎ ইঙ্গিতে দশ দিক হাসায়ে’—এ যেন বর্ষার কাছে প্রকৃতির একান্ত আকুতি।

আরও পড়ুনঃ  তারুণ্য ধরে রাখতে চান? ডায়েটে রাখুন এই ৮টি সুপারফুড, বাদ দিন এই ক্ষতিকর খাবারগুলো

মহাকবি কালিদাস তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে আষাঢ়ের প্রথম দিনে বিরহকাতর যক্ষকে মেঘের দূত করে কৈলাসে পাঠিয়েছিলেন প্রিয়ার কাছে। সেই বিরহবার্তা যুগে যুগে প্রতিটি ব্যথাতুর হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়েছে। তাই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—‘কবিবর, কবে কোন আষাঢ়ের পুণ্য দিবসে লিখেছিলে মেঘদূত।’ বৃষ্টির শব্দে যক্ষের মতোই বাঙালির হৃদয়ও অজানা বিরহে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।

কেতকীর মনমাতানো সুগন্ধ আর কদমফুলের চোখজুড়ানো শোভা আষাঢ়ের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। কদম-কেতকী ফুটবে, আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা চলবে। রিক্ত নদীপথ ভরে যাবে অমৃতপ্রবাহে, মরুবক্ষে তৃণরাজি পেতে দেবে শ্যাম আস্তরণ। গুরুগুরু মেঘগর্জনে মুখর হবে বিশ্বময়।

প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ আষাঢ়কে বলেছেন ‘ধ্যানমগ্ন বাউল-সুখের বাঁশি’। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বর্ষা এসেছে সামগ্রিক রূপবিভঙ্গে—‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে/ আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে…।’ নব তৃণদলে বাদলের ছায়া পড়ে, প্রাণ গেয়ে ওঠে—‘এসেছে এসেছে’।

বর্ষার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়েছেন মধ্যযুগের কবি জয়দেবও। তাঁর ‘গীতগোবিন্দ’-এ মেঘমেদুর বর্ষায় শ্যামল বনভূমি ও তমালছায়াঘন পৃথিবীর নয়নাভিরাম রূপ ধরা দিয়েছে। আর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘যক্ষের নিবেদন’ কবিতায় বর্ষার অভূতপূর্ব ব্যঞ্জনা—‘পিঙ্গল বিহ্বল ব্যথিত নভতল, কই গো কই মেঘ উদয় হও…।’

আরও পড়ুনঃ  প্রিয় দলের জার্সি পরে খেলা দেখায় কেন বাড়ে আবেগ?

দেশের নানা প্রান্তে গত ক’দিনের প্রকৃতি যেন রবীন্দ্রনাথের কবিতাকেই দৃশ্যমান করেছে—‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে…।’ বর্ষা মানবচিত্তে অতলস্পর্শী অপার্থিব বেদনার রূপকল্প বয়ে আনে। দূর অতীতের বিস্মৃত স্মৃতি বৃষ্টিধারায় স্নাত হয়ে মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। আকাশভাঙা জলধারার সুর শিল্পীর মনে এমন এক আবেশ রচনা করে, যা তাকে সৃজনছন্দ ও আনন্দে মাতিয়ে তোলে।

প্রচণ্ড দাবদাহে চৌচির হয়ে যাওয়া মাঠ-ঘাট, খাল-বিল, বন-বীথিকা আবার জেগে ওঠে নবীন প্রাণের ছন্দে। চারিধার থইথই পানি ধারণ করে বর্ষা বাংলায় আসে অপরূপ মায়াবী সলিলকন্যার সাজে। বর্ষা যেন অনন্ত যৌবনা, চিরকৌতুকময়ী এক দুরন্ত মেয়ের নৃত্যবিভঙ্গ। টিনের চালে টাপুর-টুপুর বৃষ্টি পড়ে, নদীতে জাগে বান, ঝরঝর ধারায় দিনরাত অবিরাম ঝরে বৃষ্টি।

তবে বর্ষা কেবল সৌন্দর্যের নয়; হতদরিদ্র মানুষের জীবনে এটি অনেক সময় মহাদুর্যোগও বয়ে আনে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন গ্রীষ্ম ও বর্ষাকে আলাদা করে চিহ্নিত করাও কঠিন হয়ে উঠছে। তবু কর্মহীন দিবস-রজনী, উদাস মনের দীর্ঘশ্বাস আর জীবনের সুখ-দুঃখের মিলিত ছায়ায় বর্ষা পায় ভিন্ন মাত্রা। সেই আবহেই ভেসে আসে গানের আকুতি—‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো… এক বরষায়।’

আরও পড়ুনঃ  তারুণ্য ধরে রাখতে চান? ডায়েটে রাখুন এই ৮টি সুপারফুড, বাদ দিন এই ক্ষতিকর খাবারগুলো

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্ষা বরণে আয়োজন করা হয়েছে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গান, কবিতা, আবৃত্তি ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে আষাঢ়ের প্রথম দিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও মুখর থাকবে বর্ষার স্মৃতি, অনুভূতি ও শুভেচ্ছায়। নদীমাতৃক বাংলার কৃষিজীবন, লোকসংস্কৃতি, গান, কবিতা ও চিত্রকলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মেঘ-বৃষ্টির অগণিত গল্প। বর্ষা উৎসব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে গত ১৮ বছর ধরে পালিত হয়ে আসছে ‘বর্ষা উৎসব’। এবারও অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘বর্ষা উৎসব–১৪৩৩’।

টানা বৃষ্টিতে বন্যার শঙ্কা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে

টানা বৃষ্টি এবং ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের চাপে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ভুগাই ও কংস নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং ভারতের আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এর প্রভাবে ভুগাই, কংস এবং আশপাশের নদীগুলোর পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

T ag

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় পোস্ট

দুই ছেলের নামে দুই ইউনিয়নের নামকরণ, সংসদে দেওয়া ব্যাখ্যায় যা বললেন প্রতিমন্ত্রী

সজল মেঘের ভেলায় চড়ে এলো বর্ষার দিন

আপডেটের সময়: ০৭:৪৫:৫১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

আনোয়ার আলদীন


আকাশে সজল সঘন মেঘের ভেলা, বাতাসে সোঁদা মাটির গন্ধ আর দূরে কোথাও নিঃসঙ্গতার মুদ্রায় বৃষ্টির ধূমল শব্দ—বর্ষা তার আগমনী বার্তা আগেই পৌঁছে দিয়েছে প্রকৃতির বুকে। ‘আকাশে আষাঢ় এলো; বাংলাদেশ বর্ষায় বিহ্বল/ মেঘবর্ণ মেঘনার তীরে তীরে নারকেলসারি/ বৃষ্টিতে ধূমল’—বুদ্ধদেব বসুর এই কবিতার নিটোল, সজল ও নিবিড় প্রকৃতির লাবণ্যে যেন জ্যৈষ্ঠের মধুর দহনকালের যবনিকা নেমে আসে। বাংলাদেশ পা রাখে বর্ষার বৃষ্টি-ধূমল চৌকাঠে। বাংলার প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের পিঙ্গল জটা ভেদ করে জীমূত-মন্দ্রে বর্ষার এলো আষাঢ়। কবি বলেছেন, ‘বজ্র মানিক দিয়ে গাঁথা আষাঢ় তোমার মালা।’

প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের রুদ্র দহন ছিন্ন করে বর্ষার দিন আসে। আষাঢ়ে জলভারানত ঘন কৃষ্ণ মেঘরাশির ওপর ভর করে বিরাট দৈত্যের মতো প্রকৃতিতে নামে বর্ষা। মেঘের গুরুগুরু গর্জনে বেজে ওঠে তার আগমনী। তৃষ্ণায় কাতর শস্যক্ষেত, বৃক্ষরাজি, লতাগুল্ম ও প্রাণীকুল অঝোর বর্ষণে ফিরে পায় প্রাণের গভীর স্পন্দন। বৈষ্ণব কবির ভাষায়—‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে মেঘমাশ্লিষ্ট সানুং’। পঞ্জিকার অনুশাসনে আজ আষাঢ়ের পয়লা দিন।

বর্ষায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাউল হৃদয় ময়ূরের মতো নেচে উঠত। তিনি গেয়েছেন, ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে, ময়ূরের মতো নাচেরে…।’ আবার—‘ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে/ জল সিঞ্চিচ ক্ষিতি সৌরভ রভসে/ ঘন গৌরবে নবযৌবনা বরষা।’ আষাঢ়ে প্রকৃতি ‘সজল শ্যাম ঘন দেওয়া’কে সাদর সম্ভাষণ জানায়, আর সর্বত্র ছড়িয়ে দেয় অনুপম সুরধ্বনির অনুরণন। প্রকৃতি, মানুষ ও সব প্রাণী যেন আগমনী গান গেয়ে বরণ করে নেয় নবীনা বর্ষার শ্যামগম্ভীর সরস রূপকে। ‘বারিধারে এসো চারিধার ভাসায়ে, বিদ্যুৎ ইঙ্গিতে দশ দিক হাসায়ে’—এ যেন বর্ষার কাছে প্রকৃতির একান্ত আকুতি।

আরও পড়ুনঃ  প্রিয় দলের জার্সি পরে খেলা দেখায় কেন বাড়ে আবেগ?

মহাকবি কালিদাস তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে আষাঢ়ের প্রথম দিনে বিরহকাতর যক্ষকে মেঘের দূত করে কৈলাসে পাঠিয়েছিলেন প্রিয়ার কাছে। সেই বিরহবার্তা যুগে যুগে প্রতিটি ব্যথাতুর হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়েছে। তাই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—‘কবিবর, কবে কোন আষাঢ়ের পুণ্য দিবসে লিখেছিলে মেঘদূত।’ বৃষ্টির শব্দে যক্ষের মতোই বাঙালির হৃদয়ও অজানা বিরহে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।

কেতকীর মনমাতানো সুগন্ধ আর কদমফুলের চোখজুড়ানো শোভা আষাঢ়ের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। কদম-কেতকী ফুটবে, আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা চলবে। রিক্ত নদীপথ ভরে যাবে অমৃতপ্রবাহে, মরুবক্ষে তৃণরাজি পেতে দেবে শ্যাম আস্তরণ। গুরুগুরু মেঘগর্জনে মুখর হবে বিশ্বময়।

প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ আষাঢ়কে বলেছেন ‘ধ্যানমগ্ন বাউল-সুখের বাঁশি’। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বর্ষা এসেছে সামগ্রিক রূপবিভঙ্গে—‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে/ আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে…।’ নব তৃণদলে বাদলের ছায়া পড়ে, প্রাণ গেয়ে ওঠে—‘এসেছে এসেছে’।

বর্ষার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়েছেন মধ্যযুগের কবি জয়দেবও। তাঁর ‘গীতগোবিন্দ’-এ মেঘমেদুর বর্ষায় শ্যামল বনভূমি ও তমালছায়াঘন পৃথিবীর নয়নাভিরাম রূপ ধরা দিয়েছে। আর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘যক্ষের নিবেদন’ কবিতায় বর্ষার অভূতপূর্ব ব্যঞ্জনা—‘পিঙ্গল বিহ্বল ব্যথিত নভতল, কই গো কই মেঘ উদয় হও…।’

আরও পড়ুনঃ  তারুণ্য ধরে রাখতে চান? ডায়েটে রাখুন এই ৮টি সুপারফুড, বাদ দিন এই ক্ষতিকর খাবারগুলো

দেশের নানা প্রান্তে গত ক’দিনের প্রকৃতি যেন রবীন্দ্রনাথের কবিতাকেই দৃশ্যমান করেছে—‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে…।’ বর্ষা মানবচিত্তে অতলস্পর্শী অপার্থিব বেদনার রূপকল্প বয়ে আনে। দূর অতীতের বিস্মৃত স্মৃতি বৃষ্টিধারায় স্নাত হয়ে মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। আকাশভাঙা জলধারার সুর শিল্পীর মনে এমন এক আবেশ রচনা করে, যা তাকে সৃজনছন্দ ও আনন্দে মাতিয়ে তোলে।

প্রচণ্ড দাবদাহে চৌচির হয়ে যাওয়া মাঠ-ঘাট, খাল-বিল, বন-বীথিকা আবার জেগে ওঠে নবীন প্রাণের ছন্দে। চারিধার থইথই পানি ধারণ করে বর্ষা বাংলায় আসে অপরূপ মায়াবী সলিলকন্যার সাজে। বর্ষা যেন অনন্ত যৌবনা, চিরকৌতুকময়ী এক দুরন্ত মেয়ের নৃত্যবিভঙ্গ। টিনের চালে টাপুর-টুপুর বৃষ্টি পড়ে, নদীতে জাগে বান, ঝরঝর ধারায় দিনরাত অবিরাম ঝরে বৃষ্টি।

তবে বর্ষা কেবল সৌন্দর্যের নয়; হতদরিদ্র মানুষের জীবনে এটি অনেক সময় মহাদুর্যোগও বয়ে আনে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন গ্রীষ্ম ও বর্ষাকে আলাদা করে চিহ্নিত করাও কঠিন হয়ে উঠছে। তবু কর্মহীন দিবস-রজনী, উদাস মনের দীর্ঘশ্বাস আর জীবনের সুখ-দুঃখের মিলিত ছায়ায় বর্ষা পায় ভিন্ন মাত্রা। সেই আবহেই ভেসে আসে গানের আকুতি—‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো… এক বরষায়।’

আরও পড়ুনঃ  তারুণ্য ধরে রাখতে চান? ডায়েটে রাখুন এই ৮টি সুপারফুড, বাদ দিন এই ক্ষতিকর খাবারগুলো

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্ষা বরণে আয়োজন করা হয়েছে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গান, কবিতা, আবৃত্তি ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে আষাঢ়ের প্রথম দিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও মুখর থাকবে বর্ষার স্মৃতি, অনুভূতি ও শুভেচ্ছায়। নদীমাতৃক বাংলার কৃষিজীবন, লোকসংস্কৃতি, গান, কবিতা ও চিত্রকলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মেঘ-বৃষ্টির অগণিত গল্প। বর্ষা উৎসব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে গত ১৮ বছর ধরে পালিত হয়ে আসছে ‘বর্ষা উৎসব’। এবারও অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘বর্ষা উৎসব–১৪৩৩’।

টানা বৃষ্টিতে বন্যার শঙ্কা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে

টানা বৃষ্টি এবং ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের চাপে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ভুগাই ও কংস নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং ভারতের আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এর প্রভাবে ভুগাই, কংস এবং আশপাশের নদীগুলোর পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।