পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক তিনটি জাতীয় কমিটি বাতিলসহ আট দফা দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজ। একই সঙ্গে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং পাহাড়ের সমস্যাগুলো রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশ থেকে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সংগঠনের সদস্য দীপায়ন খীসার সঞ্চালনায় সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন।
সমাবেশে বক্তব্য দেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ খান, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স এবং ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুলসহ অনেকে।
আবু সাঈদ খান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে অনেক কিছু দেওয়া হয়েছে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন বঞ্চিত ও উপেক্ষিত থাকলে তা রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন তোলে। পাহাড়ের মানুষ অস্ত্র ছেড়েছে বলে তাদের সঙ্গে ইচ্ছামতো আচরণ করা যাবে—এমন ধারণা ভুল।
তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিপ্রিয় মানুষকে শান্তিতে থাকার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের পুনরায় অস্ত্র ধরতে বাধ্য না করার আহ্বান জানান। তার মতে, চুক্তি বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাহাড়ের মানুষের ভূমির অধিকার নিশ্চিত ও সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটি বাতিল করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান তিনি।
শামসুল হুদা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। তার মতে, ১৯৯৭ সালের চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নই এ সংকট সমাধানের প্রধান পথ। সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটির সমালোচনা করে তিনি বলেন, এসব কমিটি মূলত আমলা ও গোয়েন্দা-নির্ভর।
নাজমুল হক প্রধান বলেন, দেশে একের পর এক আন্দোলন ও সরকার পরিবর্তন হলেও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বাস্তব পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। রাষ্ট্র পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সঙ্গে চুক্তি করেছে এবং সেটি বাস্তবায়নের দায়িত্বও রাষ্ট্রের। তাই মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান সমস্যা ভূমি বিরোধ। দীর্ঘদিনেও এর কার্যকর সমাধান হয়নি। সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটি কার্যক্রম শুরু করলে পাহাড়ের বিদ্যমান সমস্যা আরও জটিল হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সন্তোষিত চাকমা বকুল বলেন, ভারতে অবস্থানকালে সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর জুম্ম শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে এনে সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেশে ফেরার পর নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৯৭ সালে এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ২৯ বছরেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে পাহাড়ের জনগণ গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে।
সমাবেশে লিখিত বক্তব্যে জাকির হোসেন বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে শুধু নিরাপত্তার দৃষ্টিতে না দেখে রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। স্বাধীনতার পর জুম্ম জনগণের অধিকার অস্বীকার ও সামরিকায়নের মাধ্যমে দমন-পীড়নের ফলে দীর্ঘ সময় ধরে সশস্ত্র সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক ২৬টি বৈঠকের পর ১৯৯৭ সালে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ২৯ বছর পরও এর মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
সমাবেশ থেকে সরকারের কাছে যে আট দফা দাবি জানানো হয়—
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক তিনটি কমিটি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
২. চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন করতে হবে।
৩. চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যাহার করতে হবে।
৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার জন্য চুক্তি অনুযায়ী উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন ও কার্যকর করতে হবে।
৫. চুক্তি বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
৬. বিধিমালা প্রণয়নসহ দ্রুত পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকর করতে হবে।
৭. পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অবিলম্বে সংলাপের আয়োজন করতে হবে।
৮. পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি সমস্যাসহ অন্যান্য সংকটের স্থায়ী সমাধানে সরকারের উদ্যোগে বহুপক্ষীয় ও অর্থবহ সংলাপ শুরু করতে হবে।
প্রতিবেদকের নাম 





















