আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়া থেকে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে বাংলাদেশিদের পাঠানোর অভিযোগে একটি মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে স্পেনে বিচার শুরু হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১৩ হাজার ইউরো নিত চক্রটি। পরে তাদের ছোট নৌকা বা রাবারের নৌকায় করে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতে পাঠানো হতো।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকাভিত্তিক মানবপাচার চক্রগুলো এশিয়া থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সংগ্রহ করে ইউরোপে পাঠানোর কার্যক্রম বাড়িয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ প্রবণতা মোকাবিলায় স্পেনের পুলিশ মৌরিতানিয়ার জন্দারমেরি বা আধা-সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছে।
ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের এল হিয়েরো ও লানজারোতে পৌঁছানো বিভিন্ন নৌযানে মালি, সেনেগাল ও গাম্বিয়ার নাগরিকদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নাগরিকদেরও পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশি ‘মাস্টারমাইন্ডের’ বিরুদ্ধে বিচার
বড় ধরনের অভিযানে ভেঙে দেওয়া একটি মানবপাচারকারী চক্রের মামলার বিচার বুধবার লাস পালমাস আদালতে শুরু হয়েছে। স্পেনের পুলিশের অভিযোগ, চক্রটির নেতৃত্বে ছিলেন ‘মাস্টারমাইন্ড’ নামে পরিচিত এক বাংলাদেশি নাগরিক। মৌরিতানিয়ায় তার একাধিক রেস্তোরাঁ ছিল।
৫২ বছর বয়সী মোহামেদ এসএসকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মৌরিতানিয়ার কর্তৃপক্ষ স্পেনের কাছে হস্তান্তর করে।
স্পেনের পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মৌরিতানিয়া, সাহারা ও মরক্কো থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশে ৭৩টি নৌযান পাঠানোর সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। এসব নৌযানে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মানুষ ছিলেন। এ ছাড়া সমুদ্রে আরও ১৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর পর কয়েকজন অভিবাসনপ্রত্যাশী অভিযোগ করেন, চক্রের সদস্যরা তাদের ওপর সহিংসতা চালাতেন এবং নির্ধারিত অর্থের বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের জন্য ভয়ভীতি দেখাতেন। বিভিন্ন সময় তাদের আটকে রাখা ও মারধরের অভিযোগও ওঠে।
দুই দেশের পুলিশের সহযোগিতায় ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট মৌরিতানিয়ায় ‘মাস্টারমাইন্ড’কে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়। স্পেনের আদালতের জারি করা আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে তাকে আটক করা হয়েছিল।
আরেক বাংলাদেশির বিরুদ্ধেও মামলা
আগামী সপ্তাহে গ্রান কানারিয়ার রাজধানী লাস পালমাসে ওই চক্রের আরেক সহযোগী এসএমের বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তিনিও বাংলাদেশি নাগরিক।
অনিয়মিত অভিবাসনে সহায়তার মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে অপরাধ করার অভিযোগে তার চার বছর নয় মাসের কারাদণ্ড চেয়েছে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২১ ও ২০২২ সালে ফুয়ের্তেভেনতুরা ও গ্রান কানারিয়ায় পৌঁছানো তিনটি নৌকা সংগঠনের সঙ্গে এসএম জড়িত ছিলেন। ওই তিনটি নৌকায় মোট ১৬৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী ছিলেন। তাদের মধ্যে ১৪ জন বাংলাদেশি ও তিনজন পাকিস্তানি নাগরিক ছিলেন।
সরকারি কৌঁসুলিদের অভিযোগ, এসএম ‘মাস্টারমাইন্ড’ এবং চক্রটির আরেক বাংলাদেশি নেতা এইচএর পরিচালিত লজিস্টিক ব্যবস্থার অংশ ছিলেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মৌরিতানিয়ায় সংগ্রহ করা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সাময়িকভাবে থাকার ব্যবস্থা করা হতো। পরে তাদের মরক্কো, সাহারা ও মৌরিতানিয়ায় থাকা পাচারকারীদের মাধ্যমে নৌপথে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হতো।
‘মাস্টারমাইন্ড’-এর একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করতেন এসএম। কৌঁসুলিদের অভিযোগ, মৌরিতানিয়ায় পৌঁছানো বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি নাগরিকদের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পাঠানোর অপেক্ষায় রাখার জন্য বাসস্থান খুঁজে বের করা ও নিজের নামে ভাড়া নেওয়ার দায়িত্বও পালন করতেন তিনি। এ জন্য প্রত্যেক অভিবাসনপ্রত্যাশীর কাছ থেকে ২০০ ইউরো করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রথমে মৌরিতানিয়া, আলজেরিয়া বা মরক্কোতে প্রবেশের ব্যবস্থা এবং পরে তাদের স্পেনে পাঠানোর পরিকল্পনা ও সহায়তার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ক্যানারি রুটে বাংলাদেশিদের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা
২০২২ সালের অক্টোবরে গ্রান কানারিয়ায় এসএমকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি একটি ছোট নৌকায় করে ওই দ্বীপে পৌঁছেছিলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
নৌযাত্রার এক সহযাত্রী এবং দুই বছর আগে দ্বীপটিতে উদ্ধার হওয়া আরেক অভিবাসনপ্রত্যাশী তাকে শনাক্ত করেন। তাদের দাবি, বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে পৌঁছানোর জন্য তারা এসএমের সংগঠনকে অর্থ দিয়েছিলেন।
স্পেনের পুলিশ ও সরকারি কৌঁসুলিদের অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশি নাগরিকদের ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মৌরিতানিয়ায় নিয়ে আসত চক্রটি। পরে তাদের দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রার জন্য প্রস্তুত করা হতো।
প্রত্যেক ব্যক্তির কাছ থেকে ১৩ হাজার ইউরো নেওয়া হলেও তাদের ছোট নৌকা বা রাবারের নৌকায় করে আটলান্টিক মহাসাগরের পথে পাঠানো হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানো নৌযানগুলোতে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি নাগরিকদের উপস্থিতি স্পেনের কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এরপর আফ্রিকাভিত্তিক মানবপাচারকারী চক্রগুলোর এশিয়া থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশী সংগ্রহ ও ইউরোপে পাঠানোর কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত জোরদার করা হয়।
এই তদন্তের অংশ হিসেবে ‘মাস্টারমাইন্ড’কে শনাক্ত করা হয় এবং পরে মৌরিতানিয়া থেকে স্পেনে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তার নেতৃত্বাধীন চক্রের পাঠানো ৭৩টি নৌযানে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মানুষ ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন।
তবে এসব যাত্রায় সমুদ্রে অন্তত ১৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসএমের বিরুদ্ধে চলা মামলাতেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পাঠানোর জন্য একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 




















