ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নতুন নেতৃত্বের জন্য দায়িত্ব ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদায়ের বার্তাও দিয়েছিলেন তাঁরা। সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বের নামও বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পৌঁছেছিল। দুই শীর্ষ নেতার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের পরপরই নতুন কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি ছিল।
কিন্তু সেই ঘোষণার পর প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো আসেনি ছাত্রদলের নতুন কমিটি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শেষ মুহূর্তে নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে ছাত্রদলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা হবে, নাকি দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা অভিজ্ঞ নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—মূলত এই প্রশ্নেই এখন আলোচনা চলছে।
তরুণ ও অভিজ্ঞদের সমন্বয়ের চেষ্টা
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া থেমে নেই। বরং তরুণ ও অভিজ্ঞ নেতাদের সমন্বয়ে একটি নেতৃত্ব কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে।
নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার সক্ষমতার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে রাকিবুল ইসলাম ও নাছির উদ্দীন তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করার পরপরই পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে ‘জেন-জি’ শিক্ষার্থীদের মানসিকতা ও প্রত্যাশা বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ আসায় নেতৃত্ব বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে।
শীর্ষ দুই পদ নিয়ে আলোচনা
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি পদে কাকে রাখা হবে, সে বিষয়ে তারেক রহমানের ধারণা মোটামুটি স্পষ্ট। এখন সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে।
অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক আন্দোলনে ভূমিকা এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে নেতৃত্ব সাজানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
তবে অন্য একটি সূত্র বলছে, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে সিনিয়র-জুনিয়র সমন্বয় নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। কোন পদে কাকে রাখা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
তরুণদের সামনে আনার পক্ষে মত
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র বলেছে, ছাত্রদলের নেতৃত্বকে আরও তারুণ্যনির্ভর করার পক্ষে দলের শীর্ষ পর্যায়ে মত রয়েছে।
সংগঠনের নেতৃত্বে অপেক্ষাকৃত পুরোনো শিক্ষাবর্ষের নেতাদের আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিনের সমালোচনা রয়েছে। বর্তমান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নেতৃত্বের বয়স ও শিক্ষাজীবনের ব্যবধান কমানো এবং নতুন প্রজন্মের ভাষা ও প্রত্যাশা বোঝার ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র নেতারা এগিয়ে থাকবেন—এমন যুক্তিও দেওয়া হচ্ছে।
তবে এ মতের বিপরীত অবস্থানও রয়েছে।
অভিজ্ঞ নেতাদের বাদ দেওয়ার পক্ষেও নয় সবাই
সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্রের মতে, গত ১৫ বছরের রাজনৈতিক প্রতিকূল সময়ে ছাত্রদলের অনেক নেতা মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবরণের মুখোমুখি হয়েছেন। মাঠের রাজনীতিতে তাঁদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ছাত্রলীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার পাশাপাশি ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক কৌশল সম্পর্কেও তাঁদের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এই অভিজ্ঞ নেতাদের পুরোপুরি বাদ দিয়ে শুধু অপেক্ষাকৃত জুনিয়রদের হাতে শীর্ষ নেতৃত্ব তুলে দেওয়া ঠিক হবে না—এমন মতও তারেক রহমানের কাছে দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রটির দাবি।
এ কারণে দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের একটি পথ খোঁজা হচ্ছে। শীর্ষ দুই পদে একজন তুলনামূলক সিনিয়র এবং অন্যজন জুনিয়র নেতাকে রাখার চিন্তা রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ফলও বিবেচনায়
নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ফলও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্রার্থীরা ভালো ফল করলেও ছাত্রদলের ফল তুলনামূলক দুর্বল ছিল। ফলে ভবিষ্যতের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলকে কীভাবে আরও কার্যকর অবস্থানে নেওয়া যায়, নেতৃত্ব বাছাইয়ের সময় সেটিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
বিএনপির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নতুন নেতৃত্ব শুধু দলীয় কর্মসূচিতে নেতা-কর্মীদের সক্রিয় রাখলেই হবে না; সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছেও ছাত্রদলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সক্ষম হতে হবে।
সাংগঠনিক শৃঙ্খলাও বড় বিবেচনা
নতুন নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তির মূল্যায়ন, ছাত্রশিবিরের ক্ষেত্রে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নির্দেশনা বাস্তবায়নের কাঠামো তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত। বিপরীতে ছাত্রদলের ভেতরে বিভিন্ন নেতা ও পক্ষকেন্দ্রিক গ্রুপ-উপগ্রুপের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
তাঁর মতে, নতুন নেতৃত্বকে শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি পরিচালনার সক্ষমতা থাকলেই হবে না; বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা, মহানগর ও কলেজ পর্যায়ের সংগঠনকেও একই সাংগঠনিক ধারায় পরিচালনা করতে হবে।
এ ছাড়া অন্য সংগঠন থেকে এসে ছাত্রদলে জায়গা নেওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে সম্ভাব্য নেতাদের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
কমিটি কবে, এখনো স্পষ্ট নয়
রাকিবুল ইসলাম ও নাছির উদ্দীনের নেতৃত্বে বর্তমান কমিটি গঠিত হয়েছিল ২০২৪ সালের ১ মার্চ। ছাত্রদলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুই বছর। সে হিসাবে গত ১ মার্চ বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে।
নতুন নেতৃত্বের জন্য বিভিন্ন পর্যায় থেকে নাম ও মতামত নেওয়া হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারেক রহমানই নেবেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেন্দ্রিক দুটি সূত্রের দাবি, নতুন কমিটি ‘যেকোনো সময়’ ঘোষণা হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা তাঁরা জানাতে পারেননি।
এর মধ্যে তারেক রহমানের আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র সফরও কমিটি ঘোষণার সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের কার্যক্রমে অংশ নিতে তাঁর নিউইয়র্ক যাওয়ার কথা রয়েছে।
বিএনপির আরেকটি সূত্র বলছে, সফরের আগে কমিটি ঘোষণার সুযোগ রয়েছে। তা না হলে যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফেরার পর নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করা হতে পারে।
এ বিষয়ে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন বলেন, ‘আশা করছি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন কমিটি হয়ে যাবে। নতুন কমিটি হওয়ার আগে আমরা স্বাভাবিক গতিতে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।’
প্রতিবেদকের নাম 

























