মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদহার ও ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণের চাপের মধ্যে চলতি সপ্তাহে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, খাদ্য ও জ্বালানির দাম এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণসংকট এবারের বৈঠকে গুরুত্ব পাবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় তিন বছর পর ওয়াশিংটনের বাইরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এ সভা। ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী ও অর্থনীতিসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এতে অংশ নেবেন।
জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্ন এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধি, সারের ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সম্ভাব্য সুপার এল নিনোর প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেছেন, বিভিন্ন ঝুঁকি একসঙ্গে অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি ও সারের দাম, ঋণের ব্যয় এবং আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতি আগামী মাসগুলোতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
তিনি জানান, পরিস্থিতির ওপর বিশ্বব্যাংক নিবিড় নজর রাখছে। তবে এ মুহূর্তে সংস্থাটি তাদের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস সংশোধন করছে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে জি-৭ দেশগুলো জরুরি মজুত থেকে তেল ও ডিজেল বাজারে ছাড়তে সম্মত হয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহসংক্রান্ত একটি সমঝোতার ঘোষণাও দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সম্ভাবনা নিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সমালোচনা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি ঋণ বাড়ায় বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাও বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে সতর্কতা জানিয়েছেন। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ হতে পারে। তবে ইউক্রেন ও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো হতে পারে।
আইএমএফের গবেষণায় বলা হয়েছে, খাদ্য ও জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এতে দারিদ্র্য বাড়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়ে।
এদিকে বিশ্বজুড়ে সরকারি ঋণের বোঝা নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। আইএমএফের হিসাবে, সরকারি ঋণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং ২০৩০ সালের আগেই তা বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
উচ্চ সুদহার, পুঁজি স্থানান্তর এবং জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশগুলো বিশেষ চাপে রয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণসংকট
উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেককেই ভবিষ্যতে উচ্চ সুদহারে ঋণ পুনর্নির্ধারণ করতে হতে পারে। এরই মধ্যে এসব দেশে সরকারি রাজস্বের উল্লেখযোগ্য অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে।
কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর দিকে দরিদ্র দেশগুলোর ঋণ পরিশোধ সাময়িকভাবে স্থগিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্তমানে একই ধরনের পদক্ষেপের সম্ভাবনা সীমিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জি-২০ দেশগুলোর কূটনীতিকদের মতে, ঋণের উচ্চমাত্রা ও রাজনৈতিক চাপ এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্ত নিয়ে কিছু স্বল্প আয়ের দেশের উদ্বেগ রয়েছে। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে কমসংখ্যক হলেও কঠোর সংস্কারের শর্ত আরোপ করা হলে সরকারি ব্যয় সংকোচন ও কর বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ নিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঋণবিষয়ক ন্যায়বিচার নিয়ে কাজ করা ইউরোড্যাডের কর্মী ইয়োলান্ডা ফ্রেস্নিলো বলেছেন, ঋণ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি এবং আইএমএফের শর্তের কারণে অনেক দেশ ইতোমধ্যে ব্যয় সংকোচন করছে। তাঁর আশঙ্কা, ঋণ কর্মসূচির শর্তে পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
কেনিয়ায় সরকারি ব্যয় কমানো ও কর বাড়ানোর উদ্যোগের পর ব্যাপক বিক্ষোভের ঘটনা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংস্কারের সামাজিক প্রভাবও সামনে এনেছে।
নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার যোগসূত্র
ব্যাংককে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের যাতায়াত ও নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ওই অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলোতে হামলার খবরের কারণে যাত্রীদের নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জশ লিপস্কির মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্ক আরও স্পষ্ট করেছে। যুদ্ধ ও বাণিজ্যপথে বিঘ্ন শুধু নিরাপত্তা নয়, জ্বালানির সরবরাহ, মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকেও প্রভাবিত করছে।
এ পরিস্থিতিতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদকের নাম 


























