প্রায় ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এই বেতন একসঙ্গে কার্যকর না হয়ে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়। বৈঠক ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কোন গ্রেডে কত মূল বেতন
নতুন বেতনস্কেলে প্রথম গ্রেডে মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার, দ্বিতীয় গ্রেডে ১ লাখ ৩২ হাজার, তৃতীয় গ্রেডে ১ লাখ ১৩ হাজার এবং চতুর্থ গ্রেডে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে।
পঞ্চম গ্রেডে ৮৬ হাজার, ষষ্ঠ গ্রেডে ৭১ হাজার, সপ্তম গ্রেডে ৫৮ হাজার এবং অষ্টম গ্রেডে ৪৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নবম গ্রেডে ৪৪ হাজার, দশম গ্রেডে ৩২ হাজার এবং একাদশ গ্রেডে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১২তম গ্রেডে ২৪ হাজার ৩০০, ১৩তম গ্রেডে ২৪ হাজার, ১৪তম গ্রেডে ২৩ হাজার ৫০০, ১৫তম গ্রেডে ২২ হাজার ৮০০, ১৬তম গ্রেডে ২১ হাজার ৯০০, ১৭তম গ্রেডে ২১ হাজার ৪০০, ১৮তম গ্রেডে ২১ হাজার, ১৯তম গ্রেডে ২০ হাজার ৫০০ এবং ২০তম গ্রেডে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
একসঙ্গে নয়, তিন ধাপে বাস্তবায়ন
নতুন বেতনস্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও পুরো বেতন বৃদ্ধি একবারে কার্যকর হবে না। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সরকারের ওপর একসঙ্গে বড় ধরনের আর্থিক চাপ কমানো এবং মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য প্রভাব সামাল দেওয়ার জন্য এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিভিন্ন ধরনের ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পেনশনেও বড় পরিবর্তন
নতুন বেতনস্কেলের সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের তুলনামূলক বেশি হারে পেনশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
৯ হাজার টাকা বা কম নিট পেনশন হলে ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশনে ৫৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন (ওআরওপি) এখনই পুরোপুরি চালু হচ্ছে না। তথ্যের ঘাটতি ও বিপুল আর্থিক ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য ভাতা
নতুন বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসিক ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতি সন্তানের জন্য একজন সরকারি কর্মচারী মাসে ৩ হাজার টাকা করে পাবেন।
অতিরিক্ত পরিচর্যা, চিকিৎসা ও পারিবারিক ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
সব গ্রেডে মোবাইল ভাতা
নতুন কাঠামোয় প্রথম থেকে ২০তম—সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী মোবাইল ভাতার আওতায় আসবেন। আগে নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মচারীরা এই সুবিধা পেতেন।
ডিজিটাল সরকারি কার্যক্রম, অনলাইন সভা, ই-মেইল, ডিজিটাল ফাইল ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক কাজের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে মোবাইল ভাতার পরিধি বাড়ানো হয়েছে।
৩৩ লাখ মানুষ সুবিধা পাবেন
নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ সুবিধা পাবেন। এর মধ্যে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী রয়েছেন।
তবে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
কমিশনের সুপারিশের পর চূড়ান্ত অনুমোদন
অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২৩ সদস্যের কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছিল।
পরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সুপারিশ, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।
এখন প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষা
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর এখন নতুন বেতনস্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, প্রজ্ঞাপন জারি করতে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
নতুন বেতনস্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটালেও এর বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে। বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের সামনে বাড়তি ব্যয় সামলানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিপুলসংখ্যক কর্মচারী ও পেনশনভোগীর জন্য নতুন কাঠামো যথাযথভাবে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জও থাকবে।
প্রতিবেদকের নাম 













