দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে উৎপাদনে যাওয়ার পথে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী নভেম্বর মাসে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের নাম যুক্ত হবে। বর্তমানে কেন্দ্রটি চালুর আগে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারিগরি পরীক্ষা ও প্রস্তুতির কাজ চলছে।
শেষ মুহূর্তের পরীক্ষায় ব্যস্ত প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রেসারাইজার পাইলট অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি)-সংক্রান্ত ত্রুটি সমাধানের কাজ চলছে। এই পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়ার পর বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরবর্তী ধাপের কার্যক্রম শুরু হবে।
এরপর রিঅ্যাক্টরে নিউক্লিয়ার ফিশন রিঅ্যাকশন শুরু করে পাওয়ার স্টার্টআপের দিকে এগোনোর কথা রয়েছে। বি-টু ধাপ শেষ করতে প্রায় দুই থেকে তিন সপ্তাহ এবং টারবাইনের মাধ্যমে ৩০ শতাংশ স্টিম তৈরির পর্যায়ে যেতে আরও প্রায় ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। সব মিলিয়ে প্রয়োজন হতে পারে প্রায় নয় সপ্তাহ বা দুই মাস।
প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন জানিয়েছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোলে নভেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটি উৎপাদনে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শেষ পর্যায়ের কোনো পরীক্ষায় কারিগরি জটিলতা দেখা দিলে সময় আরও বাড়তে পারে।
কীভাবে উৎপাদন হবে বিদ্যুৎ?
রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হয় রিঅ্যাক্টরে পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে। বি-ওয়ান ধাপে ফুয়েল লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর বি-টু ধাপে ফিজিক্যাল স্টার্টআপের কার্যক্রম চলে।
পরবর্তী সময়ে রিঅ্যাক্টরে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপশক্তি উৎপন্ন হবে। সেই তাপের মাধ্যমে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হবে। বাষ্পের চাপ ব্যবহার করে টারবাইন ঘোরানো হবে এবং টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদিত হবে বিদ্যুৎ।
বিদ্যুতের দাম ১০ টাকার নিচে রাখার আশা
রূপপুর প্রকল্পের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ২০১৬ সালে ৪ টাকা ৬৫ পয়সা হিসেবে ধরা হয়েছিল। তবে বর্তমানে উৎপাদন খরচের সঙ্গে পরিচালন ব্যয়, বিমা ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হবে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও রূপপুর প্রকল্প কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত যাচাই শেষে বিদ্যুতের দাম চূড়ান্ত করা হবে।
প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, সব ব্যয় বিবেচনায় নিলেও রূপপুরের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকার নিচে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনায় এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহারের পর যে জ্বালানি অবশিষ্ট থাকবে, সেটিই স্পেন্ট ফুয়েল। এই জ্বালানি রিঅ্যাক্টরের ভেতরে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব।
বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ভবিষ্যতে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে ব্যবস্থাপনার কথা রয়েছে। তবে এ জন্য রাশিয়াকে কত অর্থ দিতে হবে, সে বিষয়ে সরকার-টু-সরকার পর্যায়ে বাণিজ্যিক চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
যেহেতু ব্যবহৃত জ্বালানি কয়েক বছর রিঅ্যাক্টরের ভেতর সংরক্ষণ করা সম্ভব, তাই বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক চাপ কম বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ভারি বর্জ্য নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
তবে স্পেন্ট ফুয়েলের পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপন্ন অন্যান্য ভারি বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম মনে করেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যাওয়ার পর নিয়মিতভাবে বিপুল পরিমাণ ভারি বর্জ্য তৈরি হবে।
এসব বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য এখনো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি না হওয়ায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
সবশেষে বলা যায়, কারিগরি পরীক্ষাগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হলে আগামী নভেম্বরেই রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শেষ মুহূর্তের কোনো প্রযুক্তিগত জটিলতা দেখা দিলে নির্ধারিত সময় আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
প্রতিবেদকের নাম 














