নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা, সরবরাহ সংকট কিংবা পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন—এসব বিষয়ে আগেভাগেই সতর্ক হতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)নির্ভর একটি ‘বাজার গোয়েন্দা ব্যবস্থা’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)।
টিসিবি চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা বাজারের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সংকট সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা দিতে পারবে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব তথ্য জানান।
টিসিবি চেয়ারম্যান বলেন, বাজারে কোথায় সরবরাহব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়েছে কিংবা কোথায় সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—এ ধরনের তথ্য দ্রুত পাওয়া গেলে সংস্থাটির জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে এই ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আবহাওয়া থেকে আমদানি—সব তথ্য বিশ্লেষণ
প্রস্তাবিত এআই ব্যবস্থা বৃষ্টিপাত, উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, বাজারদর এবং পণ্যের সরবরাহ প্রবাহসহ বিভিন্ন তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করবে। এর মাধ্যমে কোনো পণ্যের সংকট তৈরি হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে টিসিবি।
টিসিবি জানিয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য টিসিবি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠকও হয়েছে।
প্রকল্পের কার্যপরিধি বা টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) চূড়ান্ত হওয়ার পর বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগে দরপত্র আহ্বান করা হবে।

বাড়ানো হচ্ছে গুদাম সক্ষমতা
বাজার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নিজস্ব সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে টিসিবি। উত্তরা এলাকায় নতুন একটি গুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো কয়েকটি স্থাপনা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে টিসিবির নিজস্ব সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন বাড়বে। এতে ভবিষ্যতে ভাড়া করা গুদামের ওপর নির্ভরতা ও ব্যয় কমবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
আসছে পিওএস মেশিন ও নতুন অ্যাপ
টিসিবির সরবরাহব্যবস্থাকে আরও স্বয়ংক্রিয় করতে পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন ও নতুন মোবাইল অ্যাপ চালুর কাজও এগিয়ে চলছে। এসব প্রযুক্তি চালু হলে কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি ভোক্তাদের সুবিধাও বাড়বে বলে মনে করছে টিসিবি।
অনলাইন লটারিতে হবে ডিলার নির্বাচন
নতুন ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করছে সংস্থাটি। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী জেলা প্রশাসনের যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য আবেদনকারীদের মধ্য থেকে অনলাইন লটারির মাধ্যমে ডিলার নির্বাচন করা হচ্ছে।
টিসিবির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি ১ হাজার ৫০০ স্মার্টকার্ডধারীর বিপরীতে একজন ডিলার রাখার ব্যবস্থা করা হবে। এতে ডিলার নিয়োগে বাইরের হস্তক্ষেপের সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রয়োজন হলে আবারও ট্রাক সেল
বাজারে কোনো পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে কিংবা ঈদের মতো বিশেষ সময়ে চাহিদা বাড়লে জরুরি ভিত্তিতে ট্রাক সেল চালু করা হবে। তবে এটিকে নিয়মিত কার্যক্রম হিসেবে পরিচালনার পরিকল্পনা নেই টিসিবির।
সংস্থাটির চেয়ারম্যান জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন হলে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টিসিবি তার নিয়মিত দায়িত্বের বাইরের পণ্য নিয়েও বাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে। অতীতে আলু বিক্রি ও পেঁয়াজ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
জনবল ও অর্থায়ন বড় চ্যালেঞ্জ
টিসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণের সঙ্গে জনবল, অর্থায়ন এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগারের অভাবকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে সংস্থাটিতে প্রায় ২৭৫ জন কর্মী রয়েছেন। এর বিপরীতে গত বছর প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার পণ্য কেনা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাড়তি দায়িত্ব সামলাতে টিসিবির সাংগঠনিক কাঠামো সম্প্রসারণ এবং দেশের প্রায় ২১টি স্থানে নতুন কার্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাজার বিশ্লেষণ, পণ্য সংগ্রহ ও অন্যান্য আধুনিক কার্যক্রমের জন্য বিশেষায়িত জনবল নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছেন চেয়ারম্যান।
অর্থায়নের ব্যয় কমাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকেও ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। টিসিবির মতে, কম সুদে অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে সরকারের ভর্তুকির চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
আমদানিকারকদের ভ্যাট সুবিধার প্রস্তাব
টিসিবিতে আমদানি করা পণ্য সরবরাহকারী ব্যবসায়ীদের ভ্যাট ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রস্তাবও দিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান। তার মতে, বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক আমদানিকারক দেশীয় উৎপাদকদের তুলনায় অতিরিক্ত ভ্যাট ব্যয়ের মুখে পড়েন।
এই সমস্যা সমাধান হলে সরবরাহকারীর সংখ্যা বাড়বে, প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং পণ্য সংগ্রহের দামও কমতে পারে বলে মনে করছে টিসিবি।
পণ্যের মানে ছাড় নয়
টিসিবির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ, পণ্যের মান নিশ্চিত করা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারের ভর্তুকিনির্ভরতা কমানো।
টিসিবি চেয়ারম্যান স্পষ্ট করে বলেছেন, পণ্যের মানের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। ভোক্তাদের চাহিদা ও জরিপের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে নতুন পণ্যও টিসিবির তালিকায় যুক্ত হতে পারে।
এআইভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয় সরবরাহব্যবস্থা, উন্নত পণ্য সংগ্রহ পদ্ধতি এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে টিসিবিকে আরও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখায় সংস্থাটির সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদকের নাম 














