শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাজেট সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) দেশজুড়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। সংঘর্ষে অন্তত ১৫০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু।
রাজধানী প্যারিসের ঐতিহাসিক প্লাস দে লা রিপাবলিকসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিকেল পর্যন্ত বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ব্যারিকেড ভেঙে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেন, দোকানপাট ভাঙচুর করেন এবং কয়েকটি রেস্তোরাঁয় অগ্নিসংযোগ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দাঙ্গা পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও লাঠিচার্জ ব্যবহার করে।
ঐতিহাসিক ভবনে আগুন, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
প্যারিসের বাইরে বিভিন্ন শহরেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। লিমোজেস শহরের ঐতিহাসিক টাউন হলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলে ভবনটির ছাদ ধসে পড়ে। আঞ্চলিক প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৪৩ বছরের পুরোনো ভবনটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়েছে।
লিওঁ শহরের ঐতিহাসিক পর্যটন কার্যালয়েও অগ্নিসংযোগ করা হয়। শহরটির মেয়র গ্রেগরি দুসে জানান, পরিচিত এই পর্যটন স্থাপনাটি আগুনে পুড়ে গেছে। এ সময় দমকল বাহিনীর কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর সেন্ট-এতিয়েনে পুলিশের একটি গ্রেনেড বিস্ফোরণে এক তরুণ বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন শহরটির মেয়র রেজিস হুয়ানিকো।
দোকানপাটে লুটপাট, বিভিন্ন শহরে ভাঙচুর
বিক্ষোভের সময় প্যারিসে খাদ্য ও পোশাকের দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালানো হয়। লিল শহরে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের একটি শোরুম ভেঙে পণ্য লুটের ঘটনা ঘটেছে।
গ্রেনোবল শহরে মুখোশধারীরা একটি পর্যটকবাহী ছোট ট্রেন ছিনতাই করে দাঙ্গা পুলিশের দিকে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া মার্সেই, রেন ও তুলুজ শহরেও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগ ট্রেড ইউনিয়ন ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ কর্মীদের
শুরুতে ঝুঁকিপূর্ণ স্কুল অবকাঠামো, শিক্ষকসংকট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাজেট নিয়ে উদ্বেগ থেকে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠন ক্লাস বর্জন করে আন্দোলন শুরু করে। পরে শনিবারের বিক্ষোভে ট্রেড ইউনিয়নের কর্মী ও ২০১৮ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা যোগ দেন। এতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেশব্যাপী সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত ৩ হাজার শিক্ষক নিয়োগের আশ্বাস দিলেও আন্দোলনকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ম্যাক্রোঁ সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ
আগামী মে মাসে ক্ষমতা ছাড়ার প্রস্তুতিতে থাকা প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর জন্য এই বিক্ষোভ বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালির নেতা মারিন ল্য পেন এবং বামপন্থী দল ‘লা ফ্রান্স ইনসুমিজ’-এর জঁ-লুক মেলনশোঁর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
বিক্ষোভে সহিংসতা ছড়ানোর পেছনে মেলনশোঁর উসকানি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ল্য পেন।
সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, প্রশাসনিক দপ্তর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সিটি হলে হামলা এবং লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।
দেশজুড়ে সহিংসতা, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং বিপুলসংখ্যক আটকের ঘটনায় ফ্রান্সের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতের সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 

























