সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ২০ মাস পরও হয়নি বিধিমালা, জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে আলোচনা
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশের সুপারিশ করা হলেও এখনো তা বাধ্যতামূলক করার মতো কোনো নির্দিষ্ট আইন বা বিধিমালা তৈরি হয়নি। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশের প্রায় ২০ মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো আইনি কাঠামো না থাকায় প্রধান বিচারপতিসহ আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের সম্পদের হিসাব প্রকাশের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়নি।
সম্প্রতি কয়েকজন হাইকোর্ট বিচারপতির বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ এবং বিচার বিভাগীয় জবাবদিহি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ায় বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
নিম্ন আদালতে হিসাব জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও সর্বোচ্চ আদালতে নেই
সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন আদালতের বিচারকদের নির্দিষ্ট সময় পরপর সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী তারা প্রতি পাঁচ বছর পর সম্পদের হিসাব সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট কমিটির কাছে জমা দেন।
কিন্তু আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের জন্য একই ধরনের বাধ্যতামূলক বিধান নেই। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব বিভাগের বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী নিয়মিতভাবে জমা দেওয়ার চর্চা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশ
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। ৩৫১ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশের সুপারিশ করা হয়।
কমিশনের যুক্তি ছিল, বিচারপতিদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ করা হলে বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে, মানুষের আস্থা শক্তিশালী হবে এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, প্রয়োজন হলে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমেও এই সুপারিশের কিছু অংশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল। তবে এখন পর্যন্ত সে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
অসদাচরণের অভিযোগে বিচারপতিদের পদত্যাগ
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিচারপতিদের অসদাচরণ ও অযোগ্যতার অভিযোগ তদন্ত করে। প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ দুই বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের এই সাংবিধানিক সংস্থা তদন্ত শেষে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করতে পারে।
সুপ্রিম কোর্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই বছরে কাউন্সিলের তদন্তের মুখে আটজন বিচারপতি পদত্যাগ করেছেন। এর আগে তিনজন হাইকোর্ট বিচারপতিকে অপসারণ করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কাউন্সিলের তদন্তে সত্যতা পেয়েছিল বলে সূত্র জানিয়েছে।
তবে এসব তদন্তের কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল।
আগেও স্বেচ্ছায় সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার নজির ছিল
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার নজির একেবারে নতুন নয়। ২০১০ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক নিজে রাষ্ট্রপতির কাছে সম্পদের বিবরণী জমা দেন এবং পরে আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদেরও সম্পদের হিসাব জমা দিতে আহ্বান জানান।
তৎকালীন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি এস কে সিনহাসহ কয়েকজন বিচারপতি সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন।
এর আগে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিমও বিচার বিভাগের স্বচ্ছতার স্বার্থে বিচারপতিদের সম্পদের হিসাব প্রকাশের পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
তবে কোনো স্থায়ী আইনি কাঠামো না থাকায় পরবর্তী সময়ে এ ধরনের চর্চা আর নিয়মিত থাকেনি।
স্বচ্ছতার পক্ষে একাধিক মত
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করা হলে বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও মানুষের আস্থা বাড়তে পারে। তার মতে, প্রতিবছর হালনাগাদ সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত।
তবে এ বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন মনে করেন, সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার পরিবর্তে বিষয়টি ঐচ্ছিক রাখা যেতে পারে। তিনি আয়কর বিবরণীতে সম্পদের তথ্য থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিকের মতে, সম্পদের হিসাব প্রকাশের ক্ষেত্রে বিচারপতিদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তার মতে, প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করা হলেও সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্কতা থাকা উচিত।
আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, যদি আইন করে বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়, তাহলে তা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীসহ সরকারি দায়িত্বে থাকা সবার ক্ষেত্রেই একই নীতি প্রয়োগের পক্ষে তিনি মত দেন।
সামনে মূল প্রশ্ন আইনি কাঠামো
বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ পাঁচজন বিচারপতি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৯৯ জন বিচারপতি রয়েছেন।
ফলে বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশের বিষয়ে মূল প্রশ্ন এখন দুটি—এটি আইন করে বাধ্যতামূলক করা হবে কি না এবং করা হলে কতটুকু তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।
স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে এ বিষয়ে একটি স্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়েই এখন আলোচনা চলছে।
প্রতিবেদকের নাম 



















