জামায়াতে ইসলামী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে গ্রেপ্তার ও হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তার ছোট ছেলে সাব্বির জামান।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) বাবাকে গ্রেপ্তারের পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) কার্যালয়ে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এ অভিযোগ করেন।
সাব্বির জামানের দাবি, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার কারণেই তার বাবার বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি তারা অতীতেও দেখেছেন এবং গত ১৭ বছর ধরে একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হয়েছে বলে তারা মনে করেন।
নিজের বক্তব্যের পক্ষে আখতারুজ্জামানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও ও বক্তব্যগুলো দেখার আহ্বান জানান সাব্বির। তার ভাষায়, সেসব ভিডিও দেখলেই বোঝা যাবে তার বাবা কী বলেছেন এবং তার বক্তব্যের মধ্যে কোনো অন্যায় ছিল কি না।
যেভাবে গ্রেপ্তার হন আখতারুজ্জামান
এর আগে শুক্রবার রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার নিজ বাসা থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পরে তাকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করা হয়।
গ্রেপ্তারের আগে নিজের ফেসবুকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় আখতারুজ্জামান জানান, ডিবি পুলিশ তাকে নিয়ে যাচ্ছে। দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, জনগণের অধিকার ও বিশেষ করে প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তিনি কাজ করে যেতে চান।
তিনি আরও বলেন, জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত জনগণের পাশে থাকার এবং তাদের অধিকারের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় রয়েছে তার।
বিমানবন্দরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলা
আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তারের সূত্রপাত ১ অক্টোবর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি ঘটনা থেকে।
মদিনা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে আসা ওমরাহ যাত্রীদের লাগেজ ও জমজমের পানি পেতে বিলম্ব হওয়ায় বিমানবন্দরে কিছুটা উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ওই ফ্লাইটের যাত্রী ছিলেন আখতারুজ্জামানও।
পুলিশের ভাষ্য ও মামলার বিবরণ অনুযায়ী, পরিস্থিতি দেখতে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ ঘটনাস্থলে গেলে তার সঙ্গে আখতারুজ্জামানের বাকবিতণ্ডা হয়। এ সময় আখতারুজ্জামানের কিছু বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে তাকে বিমানবন্দরের কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে কঠোর ও হুমকিসূচক ভাষায় কথা বলতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে বিমানবন্দর থানায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজীব বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় সরকারি কাজে বাধা ও হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার সময় সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটে। সংরক্ষিত এলাকায় ভিডিও ধারণে নিষেধ করাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিনের সঙ্গেও আখতারুজ্জামানের কথা-কাটাকাটি হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় জমজমের পানির বোতল ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণের অভিযোগও রয়েছে।
তদন্তে বের হবে প্রকৃত ঘটনা
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অর্থাৎ, আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো বর্তমানে তদন্তাধীন এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
রাজনৈতিক জীবনে আখতারুজ্জামান
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর বাসিন্দা আখতারুজ্জামান বিএনপির মনোনয়নে কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরপর দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একসময় তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যুতে টকশো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে তিনি আলোচনায় থাকেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।
বর্তমানে বিমানবন্দরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে করা মামলায় তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলছে। অন্যদিকে তার পরিবার ও রাজনৈতিক সমর্থকেরা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক হয়রানি হিসেবে দেখছেন এবং তার বক্তব্য ও ঘটনার ভিডিও প্রকাশ করে বিষয়টি যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রতিবেদকের নাম 























