দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন রেকর্ড ১ হাজার ৮৭২ জন। একই সময়ে মারা গেছেন পাঁচজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৫ হাজার ৪৯৯ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৯৫ জনের।
সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই ডেঙ্গু সংক্রমণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ৭ সেপ্টেম্বর একদিনে ১ হাজার ৫৫৮ জন, ১৬ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৭৫৩ জন এবং সর্বশেষ ১ হাজার ৮৭২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফলে চলতি মাসে প্রতিদিনই নতুন করে রোগী ভর্তির রেকর্ড হচ্ছে।
দুই সপ্তাহেই আগস্টের কাছাকাছি রোগী
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২০৬ এবং আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ জন। আর সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৪ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৭ হাজার ৪২৪ জন।
অর্থাৎ আগস্টের পুরো মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহেই রোগীর সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এরপরও প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
বর্ষা, অনিয়মিত বৃষ্টি এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করায় সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশারের মডেলভিত্তিক পূর্বাভাসেও অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে।
রাজধানীর বাইরেও বাড়ছে রোগীর চাপ
গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ৮৭২ রোগীর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৩৯১, খুলনা বিভাগে ৩১৬, চট্টগ্রামে ২৮৫, বরিশালে ১৯০, রাজশাহীতে ১৬২, ময়মনসিংহে ১০৫, রংপুরে ৬৭ এবং সিলেটে ৬ জন রয়েছেন।
এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৯১ জন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৫৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এতে ডেঙ্গুর চাপ যে এখন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, তা স্পষ্ট হচ্ছে।
জ্বর কমলেই হাসপাতাল থেকে ছাড় নয়
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়েও সতর্ক করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, প্লাজমা লিকেজ এড়াতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জ্বর কমে যাওয়ার পরও চার দিন গুরুত্ব দিয়ে হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। রোগী চলে যেতে চাইলেও তাকে যেতে দেওয়া যাবে না।
প্রয়োজনে নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় হাসপাতালের গেট বন্ধ রেখেও রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
মুন্সীগঞ্জে সাংবাদিকদের মন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত রোগ এবং এর নির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রটোকল রয়েছে। দেশের সব উপজেলা পর্যায়ে এ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গুর প্রধান চিকিৎসা হচ্ছে স্যালাইন। প্রতিটি উপজেলা ও কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় স্যালাইন পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত রাখা হয়েছে। চিকিৎসায় কোনো কিছুর ঘাটতি হবে না।
মন্ত্রী আরও বলেন, রোগের একটি পর্যায়ে ডেঙ্গু রোগীর প্লাজমা লিকেজ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যেন দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়, সে বিষয়েও আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৪০ জেলায় প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন ১,৬০০ চিকিৎসক
সারা দেশে মানসম্মত ডেঙ্গু চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ৪০ জেলায় ১ হাজার ৬০০ চিকিৎসককে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনায় বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ও চিকিৎসকদের পরিচালনায় দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজে ‘ট্রেনিং অব ডক্টরস অন ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অব ডেঙ্গু’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসা বা ব্যবস্থাপনার ভুলে যেন কোনো ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু না হয়, সে জন্য চিকিৎসকদের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে মৃত্যুহার শূন্যে নামানোর চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, এবারের ডেঙ্গু মৌসুমে এখন পর্যন্ত ৬৩ হাজার ৬২৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৯ হাজার ৮৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ জন চিকিৎসাধীন। রোগী বাড়লেও আক্রান্তদের প্রায় ৯৯ শতাংশকে সুস্থ করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু আবেগ বা অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় না। রোগতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সমন্বিতভাবে সংকট মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের বিরুদ্ধে ঢালাও মিডিয়া ট্রায়ালও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মূল প্রশিক্ষণের আগে প্রায় ৩৫০ জন সিনিয়র চিকিৎসককে ‘ট্রেইনার্স ট্রেনিং’ দেওয়া হয়েছে। তারা দেশের ৪০ জেলায় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
অক্টোবরে সর্বোচ্চ সংক্রমণের আশঙ্কা
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ ও অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গু সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিন মাসব্যাপী জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং প্রায় ৩ হাজার চিকিৎসককে পুনঃপ্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাড়ির পানির পাত্র, ড্রাম-বালতি, ভবনের বেজমেন্ট, পার্কিং এলাকা, পানির মিটার ও পাইপসহ বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে পারে। শুধু প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিধনে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া কঠিন।
তাই বছরজুড়ে নজরদারি, আক্রান্ত এলাকার সঙ্গে মশার ঘনত্বের তথ্য মিলিয়ে ‘হটস্পট’ নির্ধারণ, লার্ভিসাইডিং ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ফগিংয়ের পরামর্শ দিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদরা।
আগের বছরের চিত্রও উদ্বেগজনক
২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গুতে ৪১৩ জনের মৃত্যু হয় এবং হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন।
প্রতিবেদকের নাম 
























