ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শুধু পরাজয় নয়, বরং আর্জেন্টিনার কৌশলগত ভুল এবং লিওনেল মেসিকে কার্যকরভাবে খেলায় সম্পৃক্ত করতে না পারার বিষয়টি। বিবিসি বাংলার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলের আক্রমণাত্মক ও শারীরিক ফুটবলের কৌশলই শেষ পর্যন্ত মেসিকে ম্যাচ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
নিউইয়র্ক-নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি বাজার পর যখন স্পেন শিরোপা উদযাপনে মেতে ওঠে, তখন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে দীর্ঘ সময় মাঠে বসে আবেগাপ্লুত অবস্থায় দেখা যায়। গ্যালারি থেকে সমর্থকেরা তার নামে স্লোগান দিলেও ৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তির মুখে ছিল হতাশার ছাপ।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। মেসির আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে এখনও অধিনায়কের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। কথা বলতে বলতেই তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে সংবাদ সম্মেলন ছেড়ে চলে যান।
মেসিকে খেলার বাইরে ঠেলে দেয় আর্জেন্টিনার কৌশল
বিবিসি বাংলার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেললেও ফাইনালে মেসি তার স্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। কারণ শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা বলের নিয়ন্ত্রণ বা সৃজনশীল আক্রমণের বদলে শারীরিক লড়াই ও ফাউলনির্ভর কৌশল বেছে নেয়। এতে দলের প্রধান সৃজনশীল শক্তি মেসি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
অন্যদিকে স্পেন পুরো ম্যাচে নিজেদের পরিচিত পাসিং ফুটবল ও ছন্দ ধরে রাখে। ফলে বলের নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণে স্পষ্ট আধিপত্য দেখায় ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নরা।

ফাউল আর উত্তেজনায় ছাপিয়ে যায় ফুটবল
ম্যাচজুড়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা একের পর এক কঠিন ফাউল করেন। শুরুতেই দানি ওলমোর ওপর আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের ট্যাকল নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। পরে ম্যাচের শেষ দিকে এনজো ফার্নান্দেজ দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। শেষ বাঁশির পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ম্যাচের সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়। বদলি খেলোয়াড় লিয়ান্দ্রো পারেদেসও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।
পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট আর্জেন্টিনার ব্যর্থতা
ম্যাচের পরিসংখ্যান আর্জেন্টিনার হতাশাজনক পারফরম্যান্সেরই প্রতিফলন। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্ধারিত ৯০ মিনিটে একটিও শট নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। পুরো ম্যাচে স্পেনের অন-টার্গেট শট ছিল ১২টি, যেখানে আর্জেন্টিনার ছিল শূন্য।
অতিরিক্ত সময়ের ১১৭তম মিনিটে মেসি একটি সুযোগ পেলেও তার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
আরও একটি পরিসংখ্যান আর্জেন্টিনার পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষের শেষ তৃতীয়াংশে দলটি যতটি পাস দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি ফাউল করেছে। শেষ তৃতীয়াংশে তাদের পাস ছিল ৮টি, আর ফাউল ৯টি।
অশ্রুসিক্ত বিদায়?
ফাইনালের পর সতীর্থদের সঙ্গে চোখের জল ভাগ করে নেন লিওনেল মেসি। এটি ছিল বিশ্বকাপে তার ৩৪তম ম্যাচ। তাই অনেকের ধারণা, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এটাই হয়তো আর্জেন্টাইন মহাতারকার শেষ উপস্থিতি।
যদিও শেষবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলে নেওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি, তবুও দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলে রেখে যাওয়া অসাধারণ অবদান, অসংখ্য রেকর্ড এবং অনন্য নৈপুণ্যের জন্য লিওনেল মেসি সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
প্রতিবেদকের নাম 




















