ভারতের আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের উচ্ছেদ, নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, আসামের নগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় বাঙালি মুসলমানদের ঘরবাড়ি উচ্ছেদ কেবল কিছু পরিবারের ওপর হামলা নয়; এর মধ্য দিয়ে ওই অঞ্চলে তাঁদের ঐতিহাসিক উপস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্তিত্বও সংকটের মুখে পড়ছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। পোস্টে তিনি আসামের বাঙালি মুসলমানদের ওপর কথিত উচ্ছেদ অভিযান, নাগরিকত্বের প্রশ্ন, ভাষাগত পরিচয় এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন।
নাহিদ ইসলামের দাবি, গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর দুই দিনে আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের ১ হাজার ১০০টির বেশি ঘরবাড়ি ও ১০টির বেশি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে অন্তত ৩৩টি উচ্ছেদ অভিযানে ২২ হাজারের বেশি পরিবার গৃহহীন হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর মতে, আসামে দীর্ঘদিনের জাতিগত পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ যুক্ত হওয়ায় বাংলাভাষী মুসলমানেরা বিশেষভাবে চাপের মুখে পড়ছেন। তিনি অভিযোগ করেন, উচ্ছেদ ও নাগরিকত্বসংক্রান্ত বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে তাঁদের একটি অংশকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
নাহিদ ইসলাম বলেন, আসামে উচ্ছেদ হওয়া মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া, আধার কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা এবং নাগরিকত্বসংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) থেকে ১৯ লাখ মানুষ বাদ পড়ার পর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) অমুসলিমদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ দিলেও মুসলমানদের জন্য পরিস্থিতি ভিন্ন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিতাড়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের ফলে বাংলাভাষী মুসলমানদের নাগরিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আসামের পরিস্থিতিকে ভারতের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাভাষী মুসলমানদের দীর্ঘদিনের বসবাস ও ঐতিহাসিক পরিচয় থাকা সত্ত্বেও তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
সিলেট ও বরাক উপত্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক
পোস্টে আসামের সঙ্গে বাংলাদেশের, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের ঐতিহাসিক সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, ১৮৭৪ সালে সিলেটসহ কয়েকটি অঞ্চলকে বাংলার প্রশাসনিক কাঠামো থেকে আলাদা করে আসামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। পরে ১৯৪৭ সালের গণভোটের মাধ্যমে সিলেটের অধিকাংশ অংশ পূর্ববঙ্গে যুক্ত হলেও করিমগঞ্জের কিছু অংশ আসামের সঙ্গে থেকে যায়।
নাহিদ ইসলামের মতে, এ ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে বরাক উপত্যকা ও আসামের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের মানুষের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলির ঘটনাও স্মরণ করেন। ওই ঘটনায় ১১ জন বাঙালি শহীদ হয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন। ফলে বরাক উপত্যকার ভাষাশহীদদের ইতিহাস দুই বাংলার মানুষের যৌথ ঐতিহ্যের অংশ।
ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালি মুসলমানদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আসামে টিকে থাকার আশায় তাঁদের অনেকে অসমীয়া ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এরপরও তাঁদের একটি অংশকে ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মওলানা ভাসানীর সংগ্রামের প্রসঙ্গ
আসামে বাঙালি মুসলমানদের অধিকার রক্ষার প্রসঙ্গে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনৈতিক সংগ্রামের কথা উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর মতে, এক শতাব্দী আগে আসামের চরাঞ্চলের কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভাসানীর আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘লাইন প্রথা’ ও ‘বাঙাল খেদাও’ রাজনীতির বিরুদ্ধে ভাসানীর অবস্থান ছিল আসামের বাঙালি মুসলমানদের নাগরিক মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি আরও বলেন, আসামে তাঁদের ঐতিহাসিক উপস্থিতি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের বসবাস, শ্রম ও সামাজিক অবদানের সঙ্গে জড়িত।
তাঁর বক্তব্য, আসামের বাঙালি মুসলমানদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে আইনি মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ইতিহাসের স্বীকৃতি এবং আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠাই তাঁদের অন্যতম দাবি হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
আসামের পরিস্থিতি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর মতে, উচ্ছেদের শিকার মানুষকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হলে তাঁরা দুই দেশের মাঝখানে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবেন।
তিনি বলেন, সীমান্তে বিজিবির নজরদারি এবং ভারতকে চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি আরও দৃঢ় কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু চিঠি পাঠিয়ে পরিস্থিতির সমাধান সম্ভব কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
এনসিপির আহ্বায়ক আসামের উচ্ছেদ ও সীমান্ত দিয়ে কথিত পুশইন নিয়ে বিএনপি সরকারের একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানান। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মঞ্চে বিষয়টি তুলে ধরা এবং কোনো পুশইন বা অনিশ্চিত প্রত্যাবাসন মেনে না নেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান ঘোষণার আহ্বান জানান।
পাশাপাশি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরি হলে তা আসামের বাঙালি মুসলমানদের ওপর নিপীড়নের অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই দেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা জরুরি।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্য, আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নকে শুধু প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। ইতিহাস, ভাষা, নাগরিক অধিকার ও সীমান্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।
তবে আসামে উচ্ছেদ, নাগরিকত্ব এবং সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর পোস্টে উল্লেখ করা পরিসংখ্যান ও অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
প্রতিবেদকের নাম 




















