রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি—সবখানেই বেপরোয়া চলাচল করছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। ‘যেমন খুশি তেমন চল’ নীতিতে চলা এসব তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান সড়কের শৃঙ্খলা নষ্ট করার পাশাপাশি যানজট, ভোগান্তি ও দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন।
বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ প্রভাবশালী
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব অটোরিকশা রাস্তায় নামানোর পেছনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ সদস্য, রাজনীতিবিদ, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসাবাড়ির মালিকদের মতো বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বিনিয়োগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
অল্প পুঁজিতে বেশি লাভের আশায় তারা এসব অটোরিকশা দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষের হাতে ভাড়ায় তুলে দিচ্ছেন। অটোরিকশার গ্যারেজ, মালিক ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
চালকদের অভিযোগ, প্রধান সড়কে অটোরিকশা চালানোর কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করছেন। কিন্তু অটোরিকশার পৃষ্ঠপোষক ও বিনিয়োগকারীরা অনেক ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
তাদের মতে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধ করতে হলে শুধু চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে হবে না; উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, গ্যারেজ মালিক ও বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
চালকদের আয় থেকে বড় মুনাফা
গত বুধবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মুগদা, মান্ডা, মানিকনগর, খিলগাঁও, সবুজবাগ, বনশ্রী ও রামপুরা এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধান চালানো হয়।
অনুসন্ধানে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব এলাকায় প্রায় চার হাজার অটোরিকশা গ্যারেজ রয়েছে। এসব গ্যারেজের অধীনে দুই লাখ ৪০ হাজারের বেশি অটোরিকশা চলাচল করছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এসব অটোরিকশার মালিকদের মধ্যে বাসাবাড়ির মালিক, আমলা, পুলিশ সদস্য, রাজনীতিবিদ ও বিভিন্ন শ্রেণির ব্যবসায়ীরা রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্যারেজ ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি অটোরিকশার জন্য চালকদের কাছ থেকে দৈনিক প্রায় ৫০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। এতে মাসে একটি অটোরিকশা থেকে প্রায় ১৫ হাজার এবং বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা আয় হয়।
অন্যদিকে একটি নতুন অটোরিকশা তৈরিতে খরচ পড়ে আনুমানিক ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। ফলে তুলনামূলক কম বিনিয়োগে দ্রুত মুনাফা পাওয়ার সুযোগ থাকায় বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এ খাতে বিনিয়োগ করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
লাইসেন্স-নিবন্ধন ছাড়াই সড়কে
অটোরিকশার চালকদের বড় একটি অংশ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসে এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। কোনো মূলধন ছাড়াই কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তারা অটোরিকশা চালাচ্ছেন।
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব চালকের অনেকেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। নেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ। অটোরিকশাগুলোরও কোনো আইনি নিবন্ধন নেই। এরপরও রাজধানীর ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এসব যান চলাচল করছে।
ফলে একদিকে চালকদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্যদিকে অন্যান্য যানবাহন ও পথচারীদের জন্যও দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
‘ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ উচ্চবিত্তের হাতে’
মানিকনগর এলাকার গ্যারেজ মালিক মেহেদি বলেন, আগে অটোরিকশার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ মূলত গ্যারেজ মালিকদের হাতে ছিল। এখন অল্প পুঁজিতে বেশি লাভের আশায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন।
আরেক গ্যারেজ মালিক আব্দুল্লাহ বলেন, অটোরিকশার ব্যবসা এখন আর তাদের হাতে নেই; উচ্চবিত্ত মানুষের হাতে চলে গেছে। তার দাবি, অনেক বাসাবাড়ির মালিকের এক-দুটি অটোরিকশা রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদেরও অটোরিকশা রয়েছে বলে তিনি জানান।
‘শুধু চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অমানবিক’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, বিপুলসংখ্যক অটোরিকশার পেছনে যে অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে, তার বড় অংশ প্রান্তিক চালকদের নিজস্ব নয়। বিত্তশালী শ্রেণির বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তার ভাষ্য, অতীতে যেভাবে সিএনজি অটোরিকশা চালু হয়েছিল, একইভাবে এখন প্রভাবশালীরা একাধিক অটোরিকশা কিনে ভাড়ায় দিচ্ছেন। অনেকে অবৈধ কারখানাও গড়ে তুলছেন।
ড. তৌহিদুল হকের মতে, রাস্তায় অটোচালকদের বেপরোয়া হয়ে ওঠার পেছনে এসব প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা রয়েছে। এতে ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, নিম্নআয়ের মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবন-জীবিকার প্রতি সমর্থন থাকা প্রয়োজন। তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে গিয়ে সড়কের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাকে কোনোভাবেই বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজনে অটোরিকশার বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
প্রতিবেদকের নাম 




















