কাস্পিয়ান সাগরে ইরানি জাহাজে হামলার পর বাড়ছে নতুন ভূরাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা
কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের একটি মালবাহী জাহাজে ইউক্রেনের হামলার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন মোড় নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এতদিন পরোক্ষভাবে চলা ইরান-ইউক্রেন বৈরিতা এবার সরাসরি সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৫ জুলাই কাস্পিয়ান সাগরে সংঘটিত ওই হামলার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত মিলছে।
ইউক্রেনের দাবি, হামলার শিকার জাহাজটি ইরান থেকে রাশিয়ায় সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে তেহরান এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, এটি একটি বাণিজ্যিক জাহাজ। হামলায় একজন নাবিক নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করেছে ইরান।
ঘটনার পর ইরানি কর্মকর্তারা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। জবাবে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেন, রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় দীর্ঘদিন ধরে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসা ইরান এখন নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই দুই দেশের বৈরিতার ভিত্তি তৈরি হয়। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলায় ইরানের তৈরি দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। যদিও তেহরান বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার ইউক্রেনকে দ্রুত নিজস্ব ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি উন্নয়নে বাধ্য করে। পরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রস্তাব দেয় কিয়েভ।
গত মার্চে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, ইরানি ড্রোন প্রতিরোধে সহায়তা দিতে ২০০ জনের বেশি ইউক্রেনীয় সামরিক বিশেষজ্ঞকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধসংক্রান্ত প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও জোরদার করে ইউক্রেন।
অন্যদিকে ইউক্রেনের অভিযোগ, রাশিয়া ইরানকে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার স্যাটেলাইট নজরদারির তথ্য সরবরাহ করছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির দাবি, এসব তথ্য ইরানের সামরিক পরিকল্পনা ও হামলা পরিচালনায় সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কাস্পিয়ান সাগরে জাহাজে হামলাকে জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। তার অভিযোগ, ইউরোপকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতেই ইসরায়েলের নির্দেশনায় এ হামলা চালানো হয়েছে। তিনি রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ ঘটনার জবাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-ইরানের সামরিক সহযোগিতা, ইউক্রেনের পাল্টা কৌশল এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে এতদিন পৃথক থাকা দুটি সংঘাত এখন ধীরে ধীরে একই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংকটের অংশে পরিণত হচ্ছে। কাস্পিয়ান সাগরে ইরানি জাহাজে হামলার ঘটনাকে সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদকের নাম 



















