মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আবাসিক এলাকায় রান্নার গ্যাসের সংকট বেড়েছে এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ অপেক্ষার সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ খাতেও চাপ বাড়ছে।
জানা গেছে, দেশে দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হলেও চাহিদা পূরণ সম্ভব হয়নি। গত সপ্তাহে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
দুর্ঘটনায় টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ও একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে। ফলে চাহিদার প্রায় অর্ধেক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে আবাসিক, শিল্প, পরিবহন ও বিদ্যুৎসহ প্রায় সব খাতে।
কবে স্বাভাবিক হবে পরিস্থিতি?
পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল মেরামতে দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। আগামী ৫ থেকে ৮ দিনের মধ্যে একটি বয়লার চালু করা সম্ভব হলে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে। তবে টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হতে ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগতে পারে।
আবাসিক এলাকায় চরম ভোগান্তি
রাজধানীর মগবাজার, রামপুরা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, বাড্ডা, বাসাবো, কাফরুলসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাসের চাপ নেই বা খুবই কম। ফলে অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার কিংবা এলপিজি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার কাঠ বা বিকল্প জ্বালানিতে রান্না করছেন, যা তাদের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
শিল্প উৎপাদনে বড় ধাক্কা
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে। বিশেষ করে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটওয়্যারসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্প মালিকদের দাবি, অনেক কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা হলেও এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সিএনজি স্টেশনেও দীর্ঘ লাইন
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও ভোগান্তি বেড়েছে। অনেক স্টেশন দিনের বড় অংশ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। যেসব স্টেশন খোলা রয়েছে, সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা।
স্টেশন মালিকদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, একটি সিএনজি স্টেশন স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য কমপক্ষে ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে অনেক এলাকায় তা ৪ থেকে ৫ পিএসআই-এ নেমে এসেছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব
গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও সরকারি ছুটির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কম থাকায় বড় ধরনের লোডশেডিং এড়ানো সম্ভব হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং শিল্পকারখানা পূর্ণমাত্রায় চালু হলে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে।
প্রতিবেদকের নাম 




















