বিশ্বজুড়ে সারের সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমাতে ন্যানো প্রযুক্তির সারের দিকে ঝুঁকছে সরকার। কৃষকের খরচ কমানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা ও সার খাতে সরকারি ভর্তুকির চাপ কমানোই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ন্যানো ফার্টিলাইজারের গুরুত্ব তুলে ধরে মাটির উর্বরতা রক্ষা, সারের সঠিক ব্যবহার এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে ন্যানো সারের প্রয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে গবেষণা জোরদার করে দ্রুত মাঠপর্যায়ে এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি।
ন্যানো সার নিয়ে সরকারি উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর কৃষি মন্ত্রণালয় ন্যানো ফার্টিলাইজার নিয়ে গবেষণা, বিশ্লেষণ ও নীতি প্রণয়নের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে।
পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ন্যানো সার নিয়ে পাইলট প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এ কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে গঠন করেছে বিশেষ ‘ন্যানো সেল’।
দেশের সরকারি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)-এর মাধ্যমে ন্যানো সারের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চালানো হয়েছে।
বিদেশেও বাড়ছে ন্যানো সারের ব্যবহার
গত কয়েক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন কৃষিপ্রধান দেশে ন্যানো প্রযুক্তির সার বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার শুরু হয়েছে। ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মতো দেশ ছাড়াও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পরিবেশবান্ধব কৃষির অংশ হিসেবে ন্যানো সার ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনেও ন্যানো ইউরিয়া, ন্যানো ডিএপি, ন্যানো এমওপি ও ন্যানো এনপিকে ব্যবহারের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন মাঠপর্যায়ের গবেষণায় ন্যানো সার ব্যবহারে ফলন বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ কমানো এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
বাংলাদেশেও চলছে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা
দেশেও ন্যানো সার নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে গবেষণা ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলা মার্ক কেমিক্যাল লিমিটেড গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন জেলায় ন্যানো ইউরিয়া, ন্যানো ডিএপি, ন্যানো এমওপি ও ন্যানো এনপিকে নিয়ে পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ধান, গম, শাকসবজি ও বিভিন্ন ফলের ওপর পরিচালিত এসব পরীক্ষায় ইতিবাচক ফল পাওয়ার দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সরকারি অনুমোদন ও নীতিগত সহযোগিতা পেলে জাতীয় পর্যায়ে বাজারজাত করার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে তারা।
আমদানিতে বড় ব্যয়, ভর্তুকিতেও চাপ
বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার আমদানি করতে হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইউরিয়ার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ টন, বিপরীতে উৎপাদন হয় প্রায় ১০ লাখ টন। ফলে প্রায় ১৬ লাখ টন ইউরিয়া আমদানি করতে হয়।
আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এসব সার কিনতে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের পাশাপাশি কৃষকদের কম দামে সার দিতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকিও দিতে হয়।
ন্যানো সার ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা গেলে আমদানিনির্ভরতা ও ভর্তুকির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে ৫০০ মিলিলিটারের একটি ন্যানো ইউরিয়ার বোতল ৫০ কেজির এক বস্তা প্রচলিত ইউরিয়া সারের সমপরিমাণ কার্যকারিতা দিতে পারে এবং কৃষকের খরচও তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
পরিবেশের ওপরও ইতিবাচক প্রভাবের আশা
অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জলাশয়ে দূষণ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ন্যানো প্রযুক্তির সার সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে উদ্ভিদে পুষ্টি সরবরাহের দক্ষতা বাড়তে পারে এবং অপচয় কমানো সম্ভব হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
এর ফলে মাটি ও পানিদূষণ কমানোর পাশাপাশি কৃষিতে রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে।
তবে গবেষণা ও অনুমোদনই মূল বিষয়
ন্যানো সার নিয়ে সম্ভাবনার কথা বলা হলেও বড় পরিসরে বাণিজ্যিক ব্যবহারের আগে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, নিরাপত্তা মূল্যায়ন, কার্যকারিতা যাচাই এবং যথাযথ সরকারি অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ফসল, মাটি ও জলবায়ুতে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলও পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
সবকিছু সফলভাবে প্রমাণিত হলে ন্যানো সার বাংলাদেশের কৃষিতে উৎপাদন খরচ কমানো, আমদানিনির্ভরতা হ্রাস এবং সরকারি ভর্তুকির চাপ কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর বাস্তব সুফল নির্ভর করবে গবেষণার ফলাফল, মান নিয়ন্ত্রণ এবং মাঠপর্যায়ে সঠিক প্রয়োগের ওপর।
প্রতিবেদকের নাম 




















