রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বক্তব্য নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন রংপুর জিলা স্কুলের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন তারা।
সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে রংপুর জিলা স্কুলের সামনে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলা কর্মসূচিতে ওই সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে আন্দোলনকারীরা সুষ্ঠু তদন্ত না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণা দেন। এর আগে তারা মানববন্ধন ও শোক র্যালি করেন।
নিহত গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি অবসরে যান। অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিলেন। তাঁর ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মও একই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
গত শনিবার (২১ আগস্ট) রাতে নগরীর কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়ার দাসপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৩) ও ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় পরদিন ভোরে একই এলাকার বাসিন্দা মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা পরস্পরের আত্মীয়। মুগ্ধ নগরীর সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করেন এবং সিদ্ধার্থ প্রায় আট বছর ধরে একটি জুয়েলারির দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করছেন।
রোববার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ দাবি করেন, জিজ্ঞাসাবাদে দুই যুবক হত্যাকাণ্ডে নিজেদের জড়িত থাকার কথা জানিয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যায়। সেখানে ইয়াবা সেবনের সময় শব্দ শুনে গণপতি ছাদে গেলে তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, এরপর একে একে গণপতির স্ত্রী, মেয়ে ও ঘুমন্ত ছেলেকেও হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা বাড়ির বাথরুমে গোসল করে, খাবার খায় এবং কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে বের হয়ে যায়। পরে সেগুলো একটি মন্দিরের পেছনে লুকিয়ে রাখে বলে পুলিশ জানায়। তাদের দেখানো স্থান থেকে এসব আলামত উদ্ধারের কথাও জানানো হয়েছে।
পুলিশ আরও দাবি করেছে, ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর জন্য ঘরের জিনিসপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করা হয়েছিল। পাশাপাশি আঙুলের ছাপ এড়াতে দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়।
তবে পুলিশের এই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, মাত্র দুজনকে গ্রেপ্তার করে এত দ্রুত পুরো হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয়। ঘটনার পেছনে অন্য কেউ জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী ইলতেফাত আহমেদ নূর বলেন, হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুজনকে দায়ী করে পুলিশের বক্তব্যে অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগসহ আরও কিছু বিষয় তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাঁর ধারণা, ঘটনাটি পরিকল্পিতও হতে পারে।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিস মোহাম্মদ বলেন, পুলিশ যেভাবে দুই যুবকের মাধ্যমে চারজনকে হত্যার পর গোসল ও খাওয়া-দাওয়ার কথা বলেছে, তা তারা বিশ্বাস করতে পারছে না। তিনি সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিচারের দাবি জানান।
আন্দোলনকারীরা জানান, মঙ্গলবার স্কুলে নিহতদের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা শেষে সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এদিকে, গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে রোববার বিকেলে আদালতে হাজির করা হয়। পরে মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি জানান, দুই আসামি আদালতে হত্যাকাণ্ডে নিজেদের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। এ কারণে তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। পরে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মামলাটি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা চলছে।
প্রতিবেদকের নাম 


























