দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তাৎক্ষণিকভাবে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় উচ্চমূল্যে স্পট মার্কেট থেকে কার্গো কেনার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে এবং মালয়েশিয়া থেকে আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
চড়া দামে এলএনজি, বাড়ছে সরবরাহের অনিশ্চয়তা
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে কার্গো কিনতে হচ্ছে। গত সপ্তাহে কেনা দুটি কার্গোর প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম পড়েছে ২৪ ডলারের বেশি।
সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এলএনজি সরবরাহকারীর তালিকাও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ২৯টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত থাকলেও আরও ৯টি কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
আন্তর্জাতিক বাজারেও এলএনজি সরবরাহ পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। কাতার থেকে সরবরাহ স্থগিত হওয়া, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে ৫৬ কার্গো এলএনজি আসার কথা থাকলেও নভেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ বাতিল হওয়ায় এসব কার্গোর অর্ধেক পাওয়ার প্রত্যাশা করছে পেট্রোবাংলা।
বিকল্প উৎসে গ্যাস আনার উদ্যোগ
সংকট মোকাবিলায় মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। মিয়ানমার থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের পুরোনো প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় আনার পাশাপাশি এলএনজি হিসেবেও গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে মালয়েশিয়া থেকে ক্রায়োজেনিক লরি ট্যাংকার বা আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস আমদানির নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিল্পকারখানায় দ্রুত গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগতে পারে।
এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া থেকেও এলএনজি আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে।
২০৩০ সালের মধ্যে বাড়তে পারে ১,৪০১ এমএমসিএফডি গ্যাস
গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধানে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। পেট্রোবাংলার ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৪০১ মিলিয়ন ঘনফুট বা এমএমসিএফডি অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে ২৯টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে প্রায় ২৭০ দশমিক ৮ এমএমসিএফডি গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২৫ দশমিক ৩ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে।
এ ছাড়া আটটি কূপে খনন ও ওয়ার্কওভার চলছে। এসব কাজ শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় ৯০ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাকি ১১৩টি কূপের অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি এবং অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপের কর্মসূচির পাশাপাশি নতুন গ্যাসের সন্ধানেও ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। সিসমিক জরিপের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় কাঠামো শনাক্ত করে দ্রুত অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কমছে দেশীয় উৎপাদন, বাড়ছে চাহিদা
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ২ হাজার ৫০০ এমএমসিএফডি থেকে কমে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডিতে নেমেছে। বিপরীতে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে।
বর্তমানে দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৪ হাজার এমএমসিএফডি। এর বিপরীতে গতকাল জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৩২৯ এমএমসিএফডি গ্যাস। এর মধ্যে ৭১১ এমএমসিএফডি এসেছে এলএনজি থেকে।
গ্যাস বাঁচিয়ে শিল্পে, তেল দিয়ে বিদ্যুৎ
শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের মাধ্যমে কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি কেনার সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরলে জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে।
এ লক্ষ্যে সরকার বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) ৬ হাজার কোটি টাকা সুদমুক্ত ঋণ দিয়েছে। এই অর্থ দিয়ে ফার্নেস অয়েল কেনা হবে। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে দৈনিক গড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে অর্থটি ব্যবহার করা হবে।
শিল্প ও বিদ্যুৎ—দুই খাতেই ভারসাম্যের চেষ্টা
সরকারের পরিকল্পনায় একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে লোডশেডিং কমানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতে সাশ্রয় হওয়া গ্যাস শিল্পে সরবরাহ করে উৎপাদন সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস কিছুটা কমিয়ে শিল্প খাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত। তবে দীর্ঘমেয়াদে তেলভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো উচিত নয়।
সব মিলিয়ে তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দিতে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানির পাশাপাশি নতুন গ্যাসের উৎস অনুসন্ধান, পুরোনো ক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়ানো এবং বিকল্প দেশ থেকে গ্যাস আমদানির পথ তৈরি করছে সরকার। একই সঙ্গে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়ায় শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 




















