ডিসেম্বরকে সামনে রেখে দেশে অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের আশঙ্কায় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। রাজধানীসহ গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ ও গোপালগঞ্জকে বিশেষ নজরদারিতে রাখার কথা জানা গেছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি বিএনপি এবং তাদের মিত্ররাও সতর্ক থাকবে।
সরকারের কাছে এমন তথ্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে দৈনিক ইত্তেফাক। সূত্রগুলোর দাবি, তৈরি পোশাক শিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের নেপথ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা থাকতে পারে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, এর সহযোগী সংগঠন ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ডিসেম্বরকে সামনে রেখে বিভিন্ন তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করতে পারে বলেও সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে।
প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং দলীয় সাংগঠনিক সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সরকার ও বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
বিশেষ করে রাজধানী, গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ ও গোপালগঞ্জের বিষয়ে উচ্চপর্যায় থেকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্যাংক এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা কেপিআইভুক্ত স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পোশাকশিল্পের অস্থিরতা নিয়ে জরুরি বৈঠক
ঢাকার মিরপুর, গাজীপুর, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকায় তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতা নিয়ে রবিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ডাকা জরুরি বৈঠকে এসব বিষয় আলোচনা হয়।
ডিসেম্বরকে সামনে রেখে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা যাতে সফল না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও করণীয় নির্ধারণ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকারের কাছে আরও তথ্য রয়েছে যে, চলমান শ্রমিক অসন্তোষের সঙ্গে কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের কিছু নেতা সম্পৃক্ত থাকতে পারেন। তৈরি পোশাক কারখানার আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কিছু মালিক ও অন্যান্য খাতের কয়েকজন ব্যবসায়ীর ইন্ধনের অভিযোগও রয়েছে।
শ্রমঘন এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন শ্রমিকনেতা ও ব্যবসায়ীদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সহিংসতায় রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
প্রধানমন্ত্রীর জরুরি বৈঠক এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, তৈরি পোশাক খাতে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি মহলের ইন্ধন রয়েছে। এ ঘটনায় কিছু শিল্পমালিকও জড়িত, যাঁদের কেউ কেউ বিগত সরকারের আমলে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্য ছিলেন বলে তাঁর দাবি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে মুখোশধারীরা ঢুকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আন্দোলনের নামে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এবং শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত করতে কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি মুখে মাস্ক পরে আন্দোলনস্থলে প্রবেশ করেছে।
তিনি দাবি করেন, সীমান্তের ওপার থেকেও কিছু ব্যক্তি নিরীহ পোশাকশ্রমিকদের ব্যবহার করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, যাতে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যাহত হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
রাজপথে সতর্ক থাকবে বিএনপি ও মিত্ররা
সরকার ও বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, ডিসেম্বর সামনে রেখে নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা মোকাবিলায় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং তাদের মিত্র দল ও জোটগুলোও সতর্ক থাকবে। প্রয়োজনে তারা রাজপথে সক্রিয় হতে পারে।
এরই মধ্যে গতকাল সাভারের আশুলিয়ায় এর প্রতিফলন দেখা গেছে। শ্রমিক অসন্তোষের নামে বিশৃঙ্খলা ও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধের কথা বলে সকাল থেকে বাইপাইল-জিরাবো সড়কে টহল দিয়েছেন ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা।
তবে নৈরাজ্য প্রতিরোধ করতে গিয়ে বিএনপি ও মিত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা যেন নিজেরা সংঘাত বা সহিংসতায় জড়িয়ে না পড়েন, সে বিষয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্দেশনা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রমিকদের জানমালের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রকৃত ও নিরীহ শ্রমিকদের হয়রানি না করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, চলমান সহিংস আন্দোলনের কারণে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত শ্রমিকদের মুক্তির ব্যবস্থা করবে সরকার।
আন্দোলনের মাঠ নিয়ে বিএনপির বক্তব্য
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, আন্দোলনের মাঠ কাউকে ‘মৌরসি পাট্টা’ দেওয়া হয়নি। তাঁর অভিযোগ, আন্দোলনের নামে সংঘাত সৃষ্টি করে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে।
সম্প্রতি যানবাহনে আগুন দেওয়া ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বেশিরভাগই পরাজিত শক্তির দোসর বলে দাবি করেন তিনি। এসব পরিস্থিতি বিএনপি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে বলেও জানান রিজভী।
প্রতিবেদকের নাম 




















