স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দেনমোহর পরিশোধ না করে স্ত্রীকে তা আদায়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করা হলে, পারিবারিক আদালত তার বিবেচনাধিকার প্রয়োগ করে স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি মো. আব্দুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৩ সেপ্টেম্বর এ রায় দেন। ‘ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন’ দেওয়ানি রিভিশন মামলায় দেওয়া ৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি গত মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর শরিয়াহ অনুযায়ী ২২ লাখ টাকা দেনমোহরে ইয়াকুব আলীর সঙ্গে সানজিদা নাসরিনের বিয়ে হয়। তাদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। যৌতুকের দাবি ও পারিবারিক বিরোধের জেরে ২০১৭ সালে স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে স্বামী তাকে তালাক দেন।
তালাক কার্যকর হওয়ার পর ২০১৯ সালে বকেয়া দেনমোহর, ইদ্দতকালীন খোরপোশ ও কন্যাসন্তানের খোরপোশ দাবি করে চট্টগ্রাম পারিবারিক আদালতে মামলা করেন স্ত্রী।
মামলার শুনানি শেষে ২০২২ সালের ২৫ মে আদালত স্ত্রীর পক্ষে রায় দেন। এতে দেনমোহর বাবদ ১৮ লাখ টাকা, ইদ্দতকালীন খোরপোশ ৩০ হাজার টাকা এবং কন্যাসন্তানের বকেয়া খোরপোশ ২ লাখ ১০ হাজার টাকাসহ মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা ৬০ দিনের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কন্যাসন্তানের বিয়ের আগ পর্যন্ত প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা করে খোরপোশ দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়, যা প্রতিবছর ১০ শতাংশ হারে বাড়বে।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে স্বামী ২০২৩ সালে জেলা জজ আদালতে আপিল করেন। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা জজের আদালত আপিলটি খারিজ করে পারিবারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। পরে একই বছর হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন করেন ইয়াকুব আলী।
হাইকোর্টে স্বামীর আইনজীবী জানান, ডিক্রির টাকার মধ্যে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে অবশিষ্ট টাকা এককালীন পরিশোধ করা সম্ভব নয় দাবি করে বকেয়া দেনমোহর ও খোরপোশ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চাওয়া হয়।
অন্যদিকে, স্ত্রীর পক্ষের আইনজীবী বলেন, স্বামী আর্থিকভাবে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রী ও সন্তানের আইনগত অধিকার পাওয়ার বিষয়টি বিলম্বিত করছেন। অধস্তন আদালতগুলো তথ্যপ্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতেই রায় দিয়েছেন বলেও তিনি যুক্তি দেন।
হাইকোর্ট রিভিশন আবেদন খারিজ করে অধস্তন আদালতের রায় ও ডিক্রি বহাল রাখেন।
রায়ে আদালত বলেন, দেনমোহরের কোনো অংশ মওকুফ বা মাফ করার এখতিয়ার আদালতের নেই। তবে স্ত্রী স্বেচ্ছায় ও সচেতনভাবে দেনমোহরের পুরো অংশ বা কোনো অংশ স্বামীর অনুকূলে মাফ করতে পারেন। এক্ষেত্রে মওকুফটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে করা হয়েছে—এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ থাকতে হবে। বলপ্রয়োগ, অনুচিত প্রভাব বা প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া কোনো মওকুফ বৈধ বলে গণ্য হবে না।
আদালত আরও বলেন, বর্তমান মামলায় নির্ধারিত দেনমোহর কনে ও বরের আর্থিক সামর্থ্য বা সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়নি। ফলে লিখিত চুক্তির শর্ত অমান্য করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, আবাসন ও অন্যান্য প্রয়োজন বিবেচনায় স্কুলগামী নাবালিকা সন্তানের খোরপোশের প্রয়োজনীয়তাও আদালত স্বীকার করেন।
সব দিক বিবেচনায় অধস্তন আদালতের রায় ও ডিক্রিতে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপের মতো কোনো আইনগত ত্রুটি বা এখতিয়ারগত ভুল পাওয়া যায়নি। ফলে রিভিশন আবেদনটি খারিজ করে আগের রায় বহাল রাখা হয়।
প্রতিবেদকের নাম 




















