২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে গঠিত নতুন সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটির ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার ভিত্তিতে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
সম্প্রতি ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় উপস্থাপিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে শপথ অনুষ্ঠানে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা মোদির ব্যক্তিগত শুভেচ্ছাবার্তা এবং সুবিধাজনক সময়ে ভারত সফরের আমন্ত্রণ হস্তান্তর করেন।
চীনের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
প্রতিবেদনে বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতিকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে মোংলা বন্দরের উন্নয়ন, ভারতের সীমান্তের কাছাকাছি লালমনিরহাট বিমানঘাঁটির সংস্কার এবং পেকুয়া সাবমেরিন ঘাঁটিতে চীনের সম্পৃক্ততার বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
কমিটির মতে, লালমনিরহাট বিমানঘাঁটির উন্নয়ন ভারতের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এ কারণে বিদেশি শক্তির কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার অবস্থান ও প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দেশটির দীর্ঘদিনের মানবিক আশ্রয়দানের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তাকে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, বিষয়টি প্রচলিত আইন ও প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করছে।
গঙ্গা ও তিস্তা চুক্তিতে গুরুত্ব
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এর নবায়ন দুই দেশের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
এছাড়া পশ্চিমবঙ্গসহ সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়েও একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক সমাধানে পৌঁছানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভারত।
ভিসা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা কার্যক্রমকে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
বর্তমানে সীমিত পরিসরে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ভিসা দেওয়া হচ্ছে, যার বেশিরভাগই চিকিৎসা-সংক্রান্ত ভ্রমণের জন্য।
প্রতিবেদনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ২০২৬ সালে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা বজায় রাখতে দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (CEPA) দ্রুত সম্পন্ন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া ভারতের লাইন অব ক্রেডিট (LoC)-এর আওতায় চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১২টি বাতিল করে ৮টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত শেষ করার বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 










