দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে একের পর এক চাপ তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের বাড়তি মাশুল—দুই দিকের ধাক্কায় গত নয় মাসে একটি ২০ ফুট কনটেইনারে পণ্য আমদানি করে বন্দর থেকে খালাস পর্যন্ত মোট ব্যয় গড়ে ৬৬ শতাংশ বেড়েছে।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, হরমুজের পর বাব-আল মান্দেব প্রণালিতেও অস্থিরতা বাড়লে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে একটি কনটেইনারে আমদানি ব্যয় ৬৬ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৮৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
যুদ্ধের প্রভাবে বেড়েছে জাহাজ ভাড়া
গত ডিসেম্বর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের ২৩ খাতে বাড়তি ট্যারিফ কার্যকর হয়। এতে ২০ ফুটের একটি আমদানি কনটেইনার খালাসে মাশুল বেড়েছে ৫ হাজার ৭২০ টাকা। আগে যেখানে ১০ হাজার ৫২৩ টাকা লাগত, এখন সেখানে দিতে হচ্ছে ১৬ হাজার ২৪৩ টাকা।
এই বাড়তি ব্যয়ের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই গত ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতা শুরু হয়। এর প্রভাবে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ব্যয় আরও প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, ঝুঁকি ভাতা এবং বীমা ব্যয় বাড়ায় জাহাজ ভাড়াও বেড়েছে। সব মিলিয়ে একটি কনটেইনারে অতিরিক্ত ব্যয় ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
ফ্রেইট ফরোয়াডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন জানান, যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে চট্টগ্রামে ২০ ফুটের একটি কনটেইনার আনতে যেখানে গড়ে ১ হাজার ৪০০ ডলার খরচ হতো, এখন সেখানে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ডলার।
বাংলাদেশ থেকে নিউইয়র্কে একই আকারের রপ্তানি কনটেইনার পাঠাতে আগে প্রায় ৩ হাজার ডলার লাগলেও এখন তা ৬ হাজার ডলারের বেশি। ইউরোপের হামবুর্গ বন্দরে পাঠাতে ব্যয় বেড়ে ২ হাজার ৫০০ ডলার থেকে ৫ হাজার ডলারের বেশি হয়েছে। চীনের নিংবো বন্দর থেকে সরাসরি একটি ২০ ফুট কনটেইনার আনতেও আগে দেড় হাজার ডলার লাগলেও এখন প্রায় ১ হাজার ৯৫০ ডলার খরচ হচ্ছে।
বাব-আল মান্দেব বন্ধ হলে ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা
হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব-আল মান্দেব প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। লোহিত সাগর ও বাব-আল মান্দেব হয়ে ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ রয়েছে।
এই পথ ব্যাহত হলে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রগামী জাহাজকে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হবে। এতে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হতে পারে। ফলে পণ্য পৌঁছাতে সময়ও ১২ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত বাড়তে পারে।
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, তখন সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয় ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০-৪৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এর ফলে একটি কনটেইনারে আমদানি ব্যয় ৬৬ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৮৬ শতাংশে দাঁড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এরই মধ্যে বাব-আল মান্দেব এড়িয়ে কেপ অব গুড হোপ ঘুরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জন্য অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে ‘এমটি নিমেনিয়া’ নামের একটি জাহাজ চট্টগ্রামে এসেছে। পথ পরিবর্তনের কারণে জাহাজটির মূল ভাড়ার বাইরে প্রায় ৫৪ লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা হিসাবে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬৭ কোটি টাকা।
জ্বালানি ও নিত্যপণ্যে পড়তে পারে প্রভাব
বাংলাদেশের জ্বালানি তেল, এলএনজি, এলপিজি, সারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হরমুজ ও বাব-আল মান্দেব হয়ে দেশে আসে। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।
শুধু জ্বালানি নয়, চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বড় অংশও সমুদ্রপথে আসে। উন্নয়নকাজে ব্যবহৃত ইস্পাতের কাঁচামাল ও সিমেন্ট ক্লিংকারেরও বড় অংশ আমদানিনির্ভর।
ফলে জাহাজ ভাড়া, বীমা ও বন্দর মাশুল বাড়ার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়তে পারে।
হরমুজে জ্বালানি পরিবহন কমেছে
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা কমে প্রায় ৪৯ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, হরমুজ প্রণালিতে বাধার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যবাহী জাহাজকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বীমার হার দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। অনেক জাহাজ সম্ভাব্য হামলা এড়াতে নিরাপদ জলসীমায় অবস্থান করছে, আবার কেউ কেউ ব্যয়বহুল বিকল্প পথে চলাচল করছে।
রপ্তানি বাণিজ্যেও বাড়ছে ঝুঁকি
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান ও ইন্ডিপেনডেন্ট অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব বলেন, হরমুজের পাশাপাশি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের ৮০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পাঠাতেও তখন কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হবে। জাহাজ ভাড়ার বাড়তি ব্যয় আমদানিকারক বহন করলেও রপ্তানি বাণিজ্যে এর পরোক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল বেড়েছে সর্বোচ্চ ৪১ শতাংশ
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২৩ খাতে বাড়তি ট্যারিফ আদায় করছে। এতে সর্বোচ্চ ৪১ শতাংশ পর্যন্ত মাশুল বেড়েছে।
২০ ফুট কনটেইনারের মাশুল বেড়ে হয়েছে ১৬ হাজার ২৪৩ টাকা। আগের তুলনায় এটি ৪ হাজার ৩৯৫ টাকা বেশি। আমদানি কনটেইনারে ৫ হাজার ৭২০ টাকা এবং রপ্তানি কনটেইনারে ৩ হাজার ৪৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে জাহাজ বন্দরে ভিড়তে না পারলে ওয়েটিং চার্জও বেড়েছে। ১২ ঘণ্টার জন্য ১০০ শতাংশ, ২৪ ঘণ্টায় ৩০০ শতাংশ, ৩৬ ঘণ্টায় ৪০০ শতাংশ এবং ৩৬ ঘণ্টার বেশি হলে অতিরিক্ত ৯০০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ দিতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, প্রায় ৪০ বছর পর মাশুল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে এশিয়ার ১০টি এবং আন্তর্জাতিকভাবে ১৭টি বন্দরের কার্যক্রম ও ট্যারিফ পর্যালোচনা করা হয়েছে। স্পেনের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইডমও এতে সহযোগিতা করেছে।
বাড়তি খরচ গ্রাহকের ওপর চাপাচ্ছে শিপিং কোম্পানি
বাংলাদেশের সমুদ্রপথের বাণিজ্যে দেশীয় জাহাজের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। চট্টগ্রাম বন্দরে বছরে প্রায় ৩৩ লাখ ২০ ফুট কনটেইনার ওঠানামা করে। এ চাহিদা পূরণে ২০টির বেশি আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন কাজ করছে।
মায়েরস্ক, ওশেন নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস, সিএমএ সিজিএম, এমএসসি ও হ্যাপাগ-লয়েডের মতো বড় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে মায়েরস্ক একাই দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কনটেইনার পরিবহন করে।
আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় বাড়ার কারণে বিভিন্ন রুটে নতুন করে সারচার্জ আরোপ করছে। শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েলের ভাষ্য অনুযায়ী, এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলে ড্রাই কার্গোর ক্ষেত্রে ৪০ ফুট কনটেইনারে ৩২০ ডলার এবং ২০ ফুট কনটেইনারে ১৬০ ডলার পর্যন্ত বাড়তি নেওয়া হচ্ছে।
রেফ্রিজারেটেড কনটেইনারে এই ব্যয় আরও বেশি। ইউরোপসহ বিভিন্ন রুটেও একই ধরনের অতিরিক্ত চার্জ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
বাড়ছে ডিটেনশন ও ডেমারেজ চার্জও
শুধু পরিবহন ব্যয় নয়, কনটেইনার নির্ধারিত সময়ের বেশি রাখার জন্য ডিটেনশন ও ডেমারেজ চার্জও বাড়ানো হয়েছে।
মায়েরস্ক বাংলাদেশ গত এপ্রিল থেকে ডিটেনশন চার্জ ৭ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। ওশেন নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেসও ৪ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ বাড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি ও ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক আমিরুল হক চৌধুরী বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতি টন পণ্যে জাহাজ ভাড়া ২০-২৫ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। একই সময়ে গমের দামও টনপ্রতি ৩০-৪০ ডলার বেড়েছে।
তার ভাষায়, পণ্যের দাম, জাহাজ ভাড়া ও বন্দরের বাড়তি মাশুল—সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা এখন বহুমুখী চাপের মধ্যে পড়েছেন।
সমুদ্রপথের এই ব্যয়বৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু আমদানি-রপ্তানি নয়, দেশের বাজারে নিত্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
প্রতিবেদকের নাম 




















