তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য নিয়ে বাস্তবায়িত ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস (ইসিফরজে)’ প্রকল্প দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এ প্রকল্পের মাধ্যমে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, প্লাস্টিক এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বেড়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন ও শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) অর্থায়নে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে চালু হওয়া এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে দেশের রপ্তানি খাতকে আরও বৈচিত্র্যময় ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা। প্রকল্প শুরুর সময় দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসত তৈরি পোশাক খাত থেকে। সেই নির্ভরতা কমিয়ে সম্ভাবনাময় উৎপাদন খাতগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার উপযোগী করতেই নেওয়া হয় এই উদ্যোগ।
প্রকল্প পরিচালক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ আব্দুর রহমান বলেন, ইসিফরজে প্রায় সব প্রধান কর্মসম্পাদন সূচকে নির্ধারিত লক্ষ্য অতিক্রম করেছে। তার ভাষায়, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু রপ্তানি বৃদ্ধি নয়, বরং বাংলাদেশি শিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে টেকসই ও মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
প্রকল্পের অন্যতম সফল উদ্যোগ ছিল ‘এক্সপোর্ট রেডিনেস ফান্ড (ইআরএফ)’। এই কর্মসূচির আওতায় নারী উদ্যোক্তাপ্রতিষ্ঠানসহ ৫৭০টি প্রতিষ্ঠান আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পেয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক পরিবেশ, সামাজিক ও গুণগত মান (ইএসকিউ) পূরণ, উৎপাদন আধুনিকায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন রপ্তানি বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা অর্জন করেছে।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানগুলো ২৬০টি আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স সনদ অর্জন করেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাত থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি সহ-অর্থায়ন এসেছে, যা অতিরিক্ত বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ইসিফরজে প্রকল্পের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিক্রি ৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল মাত্র ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠান ২২টি নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে।
প্রকল্প শুরুর আগে উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রপ্তানিকারকের হার ছিল ৫৯ শতাংশ, যা বর্তমানে বেড়ে ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে তাদের গড় রপ্তানি বেড়েছে ১৯২ শতাংশ।
রপ্তানি সম্প্রসারণে সহায়তার অংশ হিসেবে ৭৩টি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে ১৪টি আন্তর্জাতিক সোর্সিং প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ও রপ্তানির সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
অবকাঠামো উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লাস্টিকস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বিআইপিইটি) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি গাজীপুরে সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (সিইইটি) এবং ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি সেন্টার ফর লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার (ডিটিসিএলএফ)-এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া মুন্সীগঞ্জ ও চট্টগ্রামে নতুন দুটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও সাইট উন্নয়নের কাজও শেষ হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্সবিষয়ক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ১ লাখ ৭ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি উপকৃত হয়েছেন, যাদের ৩৮ শতাংশই নারী।
সংস্থাটির হিসাব বলছে, প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন ও শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজারের প্রায় তিন গুণ।
এছাড়া ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রকল্পের আওতাভুক্ত তৈরি পোশাকবহির্ভূত খাতগুলোর রপ্তানি প্রায় ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত অংশীদারত্ব, আর্থিক প্রণোদনা, কারিগরি সহায়তা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমের সমন্বয়ই ইসিফরজে প্রকল্পের সাফল্যের মূল ভিত্তি। এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও টেকসই শিল্পায়নের জন্য একটি কার্যকর মডেল হিসেবে কাজ করবে।
প্রতিবেদকের নাম 






















