সরকার পরিবর্তনের পর নতুন ইশতেহার, নতুন প্রতিশ্রুতি, নতুন নিয়োগ—সবই দেখা যায়। কিন্তু একটি জায়গায় ঘাটতি প্রায় একই রকম থেকে যায়: উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশে প্রকৌশলী ও অন্যান্য টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞদের যথাযথ উপস্থিতি।
বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ—অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন, পানি ব্যবস্থাপনা ও শিল্প খাতে ব্যয় হয়। বাস্তব চিত্র বলছে, মোট ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই সরাসরি প্রযুক্তি ও প্রকৌশল নির্ভর। অর্থাৎ সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, পানি, শিল্প—সবকিছুর ভেতরেই প্রকৌশলীদের ভূমিকা অপরিহার্য। অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে তাঁদের উপস্থিতি নিয়মিত বা প্রাতিষ্ঠানিক নয়।
এই বিচ্ছিন্নতা থেকেই শুরু হয় মূল সমস্যা। পরিকল্পনা একভাবে হয়, বাস্তবায়ন আরেকভাবে চলে, আর মাঝখানে তৈরি হয় বড় ব্যবধান—সময় বাড়ে, ব্যয় বাড়ে, মান কমে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা ও অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি বড় কারণ হলো দুর্বল টেকনিক্যাল মূল্যায়ন। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প শুরু হওয়ার আগেই যথাযথ ডিজাইন, বাস্তবসম্ভাব্যতা বা দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা ঠিকভাবে যাচাই করা হয় না।
ফলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো প্রায়ই “শুরু করা সহজ, টিকিয়ে রাখা কঠিন” বাস্তবতায় পড়ে যায়। কোথাও রাস্তা দ্রুত নষ্ট হয়, কোথাও অবকাঠামো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে, আবার কোথাও প্রকল্প শেষ হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।
সমস্যাটি শুধু প্রযুক্তির অভাব নয়, বরং সিদ্ধান্ত কাঠামোর মধ্যেও একটি ভারসাম্যহীনতা আছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া গেলেও সেই সিদ্ধান্তের প্রযুক্তিগত যাচাই একই গতিতে হয় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৌশলগত সতর্কতা ‘বিলম্ব’ হিসেবে দেখা হয়, যা পরে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
উন্নত অনেক দেশ এই জায়গাটিতে আলাদা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। সেখানে বড় প্রকল্প অনুমোদনের আগে স্বাধীন টেকনিক্যাল রিভিউ বাধ্যতামূলক। প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের হাতে শুধু বাস্তবায়ন নয়, পরিকল্পনার মান যাচাইয়ের দায়িত্বও থাকে। এর ফলে ভুল সিদ্ধান্ত অনেক আগেই থেমে যায়।
বাংলাদেশে কিছু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে প্রকৌশলীদের সরাসরি সম্পৃক্ততায় ব্যয় সাশ্রয় বা দক্ষতা বৃদ্ধির উদাহরণ আছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু এসব উদাহরণ এখনো ব্যক্তিনির্ভর বা প্রকল্পনির্ভর; প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, প্রকৌশলীদের অনেক সময় শুধুমাত্র “বাস্তবায়ন পর্যায়ের কর্মী” হিসেবে দেখা হয়। নীতি নির্ধারণ, প্রকল্প নকশা বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় তাঁদের ভূমিকা সীমিত থাকে। অথচ প্রকৌশলগত সিদ্ধান্তই একটি প্রকল্পের সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে দেয় শুরুতেই।
শুধু অবকাঠামো নয়, বিদ্যুৎ খাত, শিল্প খাত বা পানি ব্যবস্থাপনাতেও একই চিত্র দেখা যায়। অনেক সময় পরিকল্পনার দুর্বলতার কারণে দীর্ঘমেয়াদে অপচয় তৈরি হয়, যা পরে আর সহজে সংশোধন করা যায় না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জবাবদিহির কাঠামো। প্রকৌশলগত সিদ্ধান্ত যদি শুরুতেই শক্ত না হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত দায় গিয়ে পড়ে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পর্যায়ে। কিন্তু প্রকৃত সমস্যা তৈরি হয় অনেক আগেই—ডিজাইন ও পরিকল্পনার স্তরে।
তাই প্রশ্নটি আসলে “প্রকৌশলীদের ব্যবহার করা হচ্ছে কি না” শুধু নয়; বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে যথাযথভাবে আনা হয়েছে কি না।
সমাধানের পথ একক কোনো পদক্ষেপ নয়। বরং তিনটি স্তরে পরিবর্তন দরকার—
প্রথমত, প্রকল্প পরিকল্পনা পর্যায়ে টেকনিক্যাল মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা।
দ্বিতীয়ত, প্রকৌশলীদের নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা দেওয়া।
তৃতীয়ত, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল ও রক্ষণাবেক্ষণকে সমান গুরুত্ব দেওয়া।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল বড় বাজেট বা বড় প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। সেটি নির্ভর করে সেই প্রকল্প কতটা টেকসই, কার্যকর এবং অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত তার ওপর।
প্রকৌশলীরা যদি শুধু বাস্তবায়নের হাতিয়ার হয়ে থাকেন, তবে উন্নয়ন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। আর যদি তাঁরা পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের অংশ হন, তাহলে উন্নয়ন শুধু দ্রুত নয়, টেকসইও হতে পারে।
সেই পরিবর্তনটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
সুবাইল বিন আলম 




















