দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে বিশেষ নিরীক্ষায়। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর (ফাপাড)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাবে প্রায় ২৭ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির বিপরীতে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। শুধু এই খাতেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয়, ক্রয়প্রক্রিয়া এবং তদারকি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের জন্য নির্মিত গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্পে। ২৩০টি অডিট আপত্তির মধ্যে ১২০টিই এই আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। নির্মাণকাজ, যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র কেনা এবং বিল পরিশোধে ব্যাপক অসংগতি ধরা পড়েছে।
নিরীক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিন সিটির ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি ও জেনারেটরের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা, অথচ বিল করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। একটি ভবনের ক্ষেত্রেই সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, কিন্তু একই সরঞ্জামের জন্য বিল পরিশোধ করা হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
প্রতিবেদনে বহুল আলোচিত ‘বালিশকাণ্ড’-এর বিষয়টিও উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ৪ হাজার ৭০২টি বালিশের মধ্যে ৬০টির প্রতিটির দাম ধরা হয়েছিল ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা। প্রকৃত মূল্য প্রায় ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা হলেও এগুলো কেনা হয়েছে ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকায়, ফলে সরকারের প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। তাদের পরিদর্শনে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর কোনো হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা প্রকল্প কার্যালয়ে নেই এবং অসমাপ্ত কাজের পূর্ণাঙ্গ তালিকাও সংরক্ষণ করা হয়নি। এছাড়া চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট ২০১২ সালের পর আর কোনো বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা জমা দেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রূপপুর প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, এত বড় অঙ্কের অডিট আপত্তি সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) অনুসরণে গুরুতর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে প্রকল্প তদারকিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও জবাবদিহি থাকা উচিত বলে তিনি মত দেন।
অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নিরীক্ষায় চিহ্নিত অনিয়মের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে কার্যকর দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান তিনি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















