১৯৯৭ সালের ২৭ মে পাকিস্তানের আকাশসীমায় ভারতের একটি মিগ-২৫ গোয়েন্দা বিমান ঢুকে পড়েছিল—দীর্ঘ ২৯ বছর পর সেই গোপন অভিযানের বিষয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় এক বিমান কর্মকর্তার বক্তব্যে জানা গেছে, ঘটনাটি নিয়ে সে সময় নানা আলোচনা থাকলেও বিমানটি সত্যিই পাকিস্তানের আকাশসীমা অতিক্রম করেছিল।
ভারতীয় বিমানবাহিনীর তৎকালীন ট্রাইসনিকস স্কোয়াড্রনের সদস্য অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার প্রদীপ জস্বন্ত ঠাকুর সম্প্রতি এনডিটিভির এক পডকাস্টে এ তথ্য জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন মিগ-২৫ প্রায় ২০ কিলোমিটার উচ্চতায় ঘণ্টায় প্রায় ২ হাজার ৫৫০ কিলোমিটার বা ২.৪ ম্যাক গতিতে উড়ছিল।
ওই দিন পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় বিকট বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনা যায়। পাকিস্তান এর জন্য ভারতীয় মিগ-২৫কে দায়ী করেছিল। পরে জানা যায়, শব্দগুলো ছিল ‘সনিক বুম’—শব্দের চেয়ে বেশি গতিতে উড়ন্ত বিমানের তৈরি শকওয়েভ থেকে এ ধরনের শব্দ সৃষ্টি হয়।
ঘটনার পরদিন ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, তাদের কোনো সামরিক বিমান আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করেনি। তবে অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাস্তবে একটি মিগ-২৫ পাকিস্তানের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীও ওই বিমান শনাক্ত করেছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে। তাদের ধারণা ছিল, প্রায় ৬০ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ে যাওয়া বিমানটি ছিল ভারতের মিগ-২৫। এরপর পাকিস্তানের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান সেটিকে প্রতিহত করতে আকাশে ওঠে বলে দাবি করা হয়। তবে ততক্ষণে মিগ-২৫ অনেকটা দূরে সরে গিয়েছিল।
গোয়েন্দা মিশনে বিশেষ ভূমিকা
মিগ-২৫ মূলত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও আকাশ থেকে ছবি তোলার কাজে ব্যবহৃত হতো। বিমানটির নাকে পাঁচটি ক্যামেরা স্থাপন করা ছিল। এর চারটি ক্যামেরা পাশের বিস্তীর্ণ এলাকার ছবি তুলতে পারত, আর একটি ক্যামেরা সরাসরি নিচের দিকে তাকিয়ে নির্দিষ্ট অবস্থানের স্থানাঙ্ক ধারণ করত।
সামরিক পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে এসব ছবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। এ ধরনের মিশন ছিল অত্যন্ত গোপনীয়। এমনকি সংশ্লিষ্ট স্কোয়াড্রনের সব সদস্যও আগে থেকে জানতেন না কখন বা কোথায় কোনো অভিযান পরিচালিত হবে।
মিশনের নির্দেশ ফোনে দেওয়া হতো না। কমান্ডিং অফিসারকে সদর দপ্তরে ডেকে লক্ষ্যবস্তুর তথ্য জানানো হতো। এরপর নির্দিষ্ট পাইলটকে সেই অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হতো।
কারগিল যুদ্ধেও ব্যবহার
১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের সময়ও মিগ-২৫কে গোয়েন্দা মিশনে ব্যবহার করা হয়। সে সময় বিমানটি তুলনামূলক নিচু উচ্চতায় উড়িয়ে পাকিস্তানি অবস্থানের ছবি সংগ্রহ করা হয়েছিল। এসব ছবি ভারতীয় স্ট্রাইক পাইলটদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করতে সহায়তা করে।
তবে পরবর্তী সময়ে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির ফলে মিগ-২৫-এর মতো বিমানের প্রয়োজনীয়তা কমতে থাকে। প্রায় ২৫ বছর সেবায় থাকার পর ২০০৬ সালের ১ মে ভারতীয় বিমানবাহিনী তাদের মিগ-২৫ বহর অবসরে পাঠায়।
ফলে ১৯৯৭ সালের সেই রহস্যময় উড্ডয়নের প্রায় তিন দশক পর অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় কর্মকর্তার বক্তব্যে নতুন করে সামনে এলো—পাকিস্তানের আকাশসীমায় মিগ-২৫ প্রবেশের ঘটনাটি শুধু গুজব ছিল না; সত্যিই ভারতের একটি গোয়েন্দা বিমান সেখানে ঢুকেছিল।
তবে ভারতীয় কর্মকর্তার এই দাবির বিষয়ে পাকিস্তান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতি জানায়নি।
প্রতিবেদকের নাম 





















