কয়েকজন সংসদ-সদস্য ও নেতাকর্মীর বিতর্কিত মন্তব্য, কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে অস্বস্তিতে পড়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির কঠোর সাংগঠনিক কাঠামো ও শৃঙ্খলার কারণে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ প্রকাশ্যে খুব বেশি দেখা না গেলেও সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় দলটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এতদিন যারা আদর্শিক অবস্থান থেকে জামায়াতকে ইতিবাচকভাবে দেখতেন, তাদের একটি অংশের মধ্যেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। তবে জামায়াতের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দিয়ে পুরো দলের অবস্থান বিচার করা ঠিক নয়। তাদের দাবি, অভিযোগ উঠলেই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬৮টি আসনে জয় এবং প্রাপ্যতার ভিত্তিতে ৯টি সংরক্ষিত নারী আসন পাওয়ার পর সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে জামায়াত। এর মধ্যেই কয়েকজন জনপ্রতিনিধিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ দলটির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
আমির হামজার বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক
বিশিষ্ট ইসলামি বক্তা ও সংসদ-সদস্য মুফতি আমির হামজার কয়েকটি বক্তব্য নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। চলতি বছরের মার্চের শেষ দিকে কুষ্টিয়া সদরের একটি মসজিদে জুমার আগে দেওয়া বক্তব্যে নারী সংসদ-সদস্যদের নিয়ে আপত্তিকর ও বডি শেমিং মন্তব্যের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা হয় এবং তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলাও করা হয়।
একই সময়ে কুষ্টিয়ায় দেওয়া আরেক বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে ‘নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষী’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এ বক্তব্যের জেরেও সিরাজগঞ্জে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা ও সমন জারি হয়।
এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে একটি ওয়াজে অসত্য ও মানহানিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগও উঠেছিল আমির হামজার বিরুদ্ধে। তিনি দাবি করেছিলেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ছাত্র ছিলেন এবং হলে শিক্ষার্থীদের মদ্যপান ও শিক্ষকদের মারধরের মতো ঘটনা ঘটত। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীরা এসব বক্তব্যকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে তাকে আইনি নোটিশ পাঠায়।
গাজী নজরুলকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ-সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয় ২১ জুলাই। মগবাজারের একটি হোটেলে এক তরুণীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে গাজী নজরুল ওই তরুণীকে মরিয়ম নামে পরিচয় দিয়ে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন।
তার প্রথম স্ত্রীও গণমাধ্যমের সামনে জানান, দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে হয়েছে। মরিয়মও নিজেকে সংসদ-সদস্যের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। তবে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ তদন্তে গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে নৈতিকস্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে স্থায়ীভাবে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
একই সঙ্গে তার সদস্যপদ বাতিলের জন্য জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে চিঠি পাঠায় জামায়াত। তবে তার সংসদ সদস্যপদ এখনো বাতিল হয়নি।
পরবর্তী সময়ে ২০ সেপ্টেম্বর বিকেলে মরিয়ম বেগমের ঝুলন্ত মরদেহ তার ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় বর্তমানে গাজী নজরুল কারাগারে রয়েছেন।
সরকারি অনুদান ও ত্রাণ নিয়ে প্রশ্ন
নড়াইল-২ আসনের সংসদ-সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুর বিরুদ্ধেও ঐচ্ছিক তহবিলের অর্থ বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, উপকারভোগীদের তালিকায় তিনি নিজের মেয়ের নামে দুই দফায় ১০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেন। পাশাপাশি নিজ ইউনিয়ন ও শ্বশুরবাড়ি এলাকার মানুষের আধিক্য নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
তবে সংসদ-সদস্যের দাবি, তার প্যাডে করা অগ্রিম স্বাক্ষর ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সহকারী ওই তালিকা তৈরি করেছিলেন। এ ঘটনায় ব্যক্তিগত সহকারীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন তিনি।
রংপুরের পীরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ-সদস্য মো. নুরুল আমীনের বিরুদ্ধে টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে আত্মীয়দের সভাপতি করার অভিযোগ ওঠে। একইভাবে খুলনা-৬ আসনের সংসদ-সদস্য আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ বিতরণে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে।
এসব ঘটনার পর জামায়াতের হাইকমান্ড সংসদ-সদস্যদের কাছে লিখিত নির্দেশনা পাঠায়। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের স্বাক্ষর করা নির্দেশনায় সরকারি অনুদান, ত্রাণ বা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন, ব্যক্তিগত সহকারী, ব্যক্তিগত সচিব কিংবা তাদের স্বজনদের জন্য সুপারিশ বা বরাদ্দ না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সংসদে বক্তব্য নিয়েও সমালোচনা
নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ-সদস্য আব্দুল মুনতাকিম সংসদে দেওয়া বাজেট বক্তৃতায় বাবাকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হিসেবে উল্লেখ করে সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে তার নির্বাচনি হলফনামায় বাবা-মা দুজনই জীবিত থাকার তথ্য সামনে আসে। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তিনি বক্তব্যটি ভুল বা অসাবধানতাবশত হয়েছে বলে দুঃখ প্রকাশ করেন।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ-সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী মো. আরমান উদ্দিনকে ঘিরেও এলাকায় প্রভাব বিস্তারসহ নানা অভিযোগের কথা আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়ভাবে তাকে ‘আরমান এমপি’ নামে ডাকার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ-সদস্য মিজানুর রহমান সংসদ-সদস্যদের সরকারি বাসভবনের জন্য ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও পর্দার দাবি তুলে সমালোচিত হন।
বাইসাইকেল থেকে সার মজুত—ব্যবস্থা নিয়েছে জামায়াত
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি বরাদ্দের একটি বাইসাইকেল প্রকৃত উপকারভোগীর পরিবর্তে নিজের নাতনিকে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে বাইসাইকেলটি ফেরত দিয়ে প্রকৃত উপকারভোগীকে দেওয়া হয় এবং তাজুল ইসলামকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।
মুন্সীগঞ্জে নৈতিকস্খলন ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দুই রুকনের সদস্যপদ বাতিল করে দলটি। রাজধানীর ধানমন্ডিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় চার নেতাকর্মীকেও বহিষ্কার করা হয়।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে সার মজুতের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানার পর উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির (২) মো. মনিরুল ইসলামের রুকুনিয়াত বাতিল করা হয়। তার বাড়ি থেকে ১৮ বস্তা ইউরিয়া সার উদ্ধারের পর তাকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত।
কামারখন্দ উপজেলা জামায়াতের আমির ইউসুফ আলী জানান, দলীয় আদর্শবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে মনিরুল ইসলামের সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে।
আক্তারুজ্জামানকে ঘিরে নতুন উত্তাপ
সর্বশেষ ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামানের অশোভন আচরণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। তাকে ঘিরে মামলা, গ্রেফতার, রিমান্ড এবং কারাগারে পাঠানোর ঘটনা ঘটে। আদালত চত্বরেও তার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এ ঘটনায় কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এমন বিতর্কিত পরিস্থিতির মধ্যে থাকা একজন ব্যক্তিকে জামায়াতে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল কি না। তবে দলটি আক্তারুজ্জামানের পাশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছে। তার পক্ষে প্রতিবাদ ও বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করছে জামায়াত।
জামায়াতের বক্তব্য, দ্রুত ব্যবস্থাই তাদের অবস্থান
দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নৈতিকতা, আদর্শ ও দলীয় শৃঙ্খলার কারণেই জামায়াতের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে। কিছু ঘটনায় দলীয় নেতাকর্মীরা নিজেরাও আহত হলেও নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার প্রশ্নে জামায়াত কোনো আপস করে না।
তিনি বলেন, মানুষের সংগঠনে ব্যক্তি হিসেবে ভুলত্রুটি ঘটতে পারে। তবে ভুলের বিরুদ্ধে দল অতীতেও কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও নেবে।
সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম বলেন, দলের কেউ অন্যায় বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কয়েকজন সংসদ-সদস্যের স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠার পর কেন্দ্র থেকে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে। একজন সংসদ-সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং তার সদস্যপদ বাতিলের জন্য স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বিষয়টি
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর মতে, দুর্নীতি ও নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে জামায়াত সম্পর্কে মানুষের ধারণা এখনও তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। একজন সংসদ-সদস্যের বিরুদ্ধে নৈতিকস্খলনের অভিযোগ ওঠার পর দ্রুত বহিষ্কারের সিদ্ধান্তকে তিনি প্রশংসনীয় বলে মনে করেন।
মেজর আক্তারুজ্জামানের ঘটনাকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখেন তিনি। তার মতে, বিমানবন্দরে যাত্রীদের হয়রানি ও অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিবাদের ভাষা ও আচরণ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জামায়াত যে নীতি-নৈতিকতার কথা বলে, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা তার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে দলটির ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। এমনকি তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। তবে অভিযোগের পর দলটির দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখেন।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আব্দুল লতিফ মাসুমও মনে করেন, অনৈতিক কর্মকাণ্ড একজন মানুষের ভুলের ফল হতে পারে, কিন্তু জামায়াতের কাছ থেকে মানুষ এ ধরনের ঘটনা প্রত্যাশা করে না। তার মতে, দলটির দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
আক্তারুজ্জামানের জামায়াতে যোগদানকে তিনি নেতিবাচক মনে করেন না। বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানির প্রতিবাদ সঠিক হলেও তার ভাষা ও আচরণ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় একদিকে জামায়াতের কয়েকজন নেতা ও জনপ্রতিনিধির কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে অভিযোগের পর দলটির দ্রুত সাংগঠনিক পদক্ষেপও আলোচনায় এসেছে। ফলে বিতর্কিত ঘটনাগুলো দলটির ভাবমূর্তিতে কতটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 























