যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেনে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র গরম ও অন্ধকারের মধ্যে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন শহরের বাসিন্দারা। তবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকে ছাড়িয়ে সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে হাসপাতালগুলোতে। বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় ব্যাহত হচ্ছে জরুরি চিকিৎসাসেবাও।
উপকূলীয় শহর এডেনে দীর্ঘদিন ধরেই প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া বিরাজ করছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে ফ্যান ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়। রাতে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়ে, আর দিনের বেলায় স্বাভাবিক কাজকর্মও ব্যাহত হয়। শিক্ষার্থীদের বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আগেই পড়াশোনা ও প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করার চেষ্টা করতে হয়।
গরম থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে অনেক শিশু ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। তরুণ ও পরিবারের সদস্যদের অনেকেই ছুটে যান সমুদ্রের তীরে। ঠান্ডা বাতাসের আশায় সেখানে কিছুটা সময় কাটান তারা।
তবে হাসপাতালগুলোর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বিদ্যুৎ না থাকলেও হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। অস্ত্রোপচার, জরুরি চিকিৎসা, রোগীর জীবন রক্ষাকারী যন্ত্রসহ হাসপাতালের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের জন্যই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন।
ইয়েমেনের বিদ্যুৎ সংকট অবশ্য যুদ্ধ শুরুর আগ থেকেই চলে আসছে। যুদ্ধের আগে দেশটির মোট জনসংখ্যার মাত্র প্রায় ৫৫ শতাংশ কোনো না কোনো উৎস থেকে বিদ্যুৎ সুবিধা পেত। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে এ হার ছিল অন্যতম কম।
২০১৫ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, জ্বালানি সংকট এবং পুরোনো উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এডেনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও নিয়মিত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে বাসিন্দাদের।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চলতি বছরের এক মূল্যায়ন অনুযায়ী, কাঠামোগত দুর্বলতা ও জ্বালানি সংকটের কারণে এডেনে দিনে মাত্র দুই থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে এডেনের অনেক এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তখন ব্যাটারি কিংবা সৌরবিদ্যুৎচালিত ছোট বাতিই হয়ে ওঠে ভরসা। কখন বিদ্যুৎ আসবে কিংবা ফিরে আসার পর কতক্ষণ থাকবে—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
গ্রীষ্মকালে সংকট আরও তীব্র হয়। এ সময় এডেনের তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরের ভেতর গরম ও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়। বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও তাপমাত্রা খুব একটা কমে না।
এক বাসিন্দার ভাষায়, কখনো কখনো ঘুমের মধ্যেই বিদ্যুৎ চলে আসে। তখন বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে ঘুম থেকে উঠতে হয়। কখন বিদ্যুৎ আসছে আর কখন যাচ্ছে, সেটিই যেন তাদের জীবনের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে পরিবারের দৈনন্দিন জীবনেও। শিশুরা ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না, বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে সংরক্ষিত খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এমনকি ঘরের অনেক সাধারণ কাজও বিদ্যুৎ আসা পর্যন্ত আটকে রাখতে হচ্ছে।
দিনের শেষভাগে তাই এডেনের সমুদ্রতীরে মানুষের ভিড় বাড়ে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্যরা সেখানে জড়ো হন। কেউ পানিতে নামেন, কেউ আবার সমুদ্রের ধারে বসে কিছুটা স্বস্তির বাতাস পাওয়ার অপেক্ষা করেন।
যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্বল অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে এডেনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এখন চরম ভঙ্গুর। আর এই সংকট শুধু অন্ধকারে থাকার দুর্ভোগই তৈরি করছে না—হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতেও তৈরি করছে জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি।
প্রতিবেদকের নাম 
























