গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণসহ সাত দফা দাবিতে আগামী ৩১ অক্টোবর তৃতীয় দফায় লংমার্চ কর্মসূচি পালন করবে ১১ দলীয় ঐক্য। রাজধানীর বায়তুল মোকাররম থেকে খুলনা হয়ে কুষ্টিয়া পর্যন্ত প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কুষ্টিয়া জেলা স্কুল মাঠে সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) লংমার্চের প্রস্তুতি নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির জরুরি সভা শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সভায় সভাপতিত্ব করেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম। বৈঠকে জোটের শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, ৩১ অক্টোবর শনিবার সকাল থেকে ঢাকার বায়তুল মোকাররম হয়ে খুলনা ও পরে কুষ্টিয়ার উদ্দেশে লংমার্চ শুরু হবে। কর্মসূচির রুট, বিভিন্ন স্থানে পথসভা এবং সার্বিক বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এর আগে চট্টগ্রাম ও রংপুরে দুটি লংমার্চ দেশবাসী ও সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় সফল হয়েছে। এবারও প্রশাসন, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, শ্রমিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছেন তারা।
সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার ও তার সঙ্গে আচরণ, কুষ্টিয়ায় এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানান তিনি। এসব ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবিও জানিয়েছেন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা।
সাত দফা দাবিতে কর্মসূচি
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের কয়েক মাসের শাসনে মানুষের দুর্ভোগ কমার বদলে বেড়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সাত দফা দাবি সামনে রেখে তৃতীয় দফার লংমার্চ আয়োজন করা হচ্ছে।
যেভাবে এগোবে লংমার্চ
সকাল ৭টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সূচনা হবে। সেখানে ১১ দলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেবেন। এরপর সকাল ৮টায় গাড়িবহর পদ্মা সেতু হয়ে মাওয়া সড়ক দিয়ে কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা হবে।
পদ্মা সেতু পার হয়ে শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবা এলাকায় প্রথম পথসভা করার কথা রয়েছে। এরপর মাদারীপুর, ভাঙ্গা ও ফরিদপুর হয়ে গাড়িবহর গোপালগঞ্জের দিকে যাবে। পরে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার কাটাখালী মোড়ে পথসভা হবে।
এরপর রূপসা সেতু পার হয়ে খুলনা মহানগরীর বাবরী চত্বর বা শিববাড়ী মোড়ে পথসভা করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখান থেকে ফুলতলা বাসস্ট্যান্ডের স্বাধীনতা চত্বরেও আরেকটি পথসভা হবে।
পরে যশোরের চাচড়া মোড়ে পথসভা শেষে লংমার্চের গাড়িবহর ঝিনাইদহের দিকে যাবে। ঝিনাইদহ শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বড় একটি পথসভা শেষে কুষ্টিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করবে তারা। রাত আনুমানিক ৯টার মধ্যে কুষ্টিয়া জেলা স্কুল মাঠে পৌঁছে সমাপনী সমাবেশ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে সময়ের হিসাবে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয় জানিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রাত ৯টার মধ্যে কুষ্টিয়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা থাকবে।
শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান
লংমার্চে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না করার ঘোষণা দিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, উসকানি বা অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা হলে সর্বোচ্চ ধৈর্য ও সংযমের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে। কর্মীরা কোনো ধরনের উসকানিতে পা দেবেন না।
প্রায় ৪০০ কিলোমিটারের এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের সহযোগিতা চান তিনি। একই সঙ্গে লংমার্চের রুটের সড়কগুলো মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করার জন্য সড়ক বিভাগ, জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান।
লংমার্চের কারণে সাধারণ মানুষের সাময়িক ভোগান্তির জন্য আগাম দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সাধারণ যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি তারা গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন।
অটোরিকশা চালকদের দাবির প্রতি সমর্থন
অটোরিকশা চালকদের আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শ্রমজীবী ও পেশাজীবী মানুষের ন্যায্য দাবির প্রতি ১১ দলীয় ঐক্যের সমর্থন রয়েছে। তবে ভাঙচুর, সহিংসতা কিংবা জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠুক—এমন কোনো কর্মসূচি তারা সমর্থন করেন না। অটোরিকশা চালকদের ন্যায্য দাবিগুলো সরকারকে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা শহরে অটোরিকশা যানজটের অন্যতম কারণ কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এ বিষয়ে দুই ধরনের যুক্তি রয়েছে। ১১ দলীয় ঐক্যের মধ্যে আলোচনা ও বিশ্লেষণের পর তাদের অবস্থান জানানো হবে।
দুর্গাপূজার কারণে তারিখ পরিবর্তন
লংমার্চের তারিখ পরিবর্তনের বিষয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শুরুতে ১০ অক্টোবর কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা ছিল। তবে শারদীয় দুর্গাপূজার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তারিখ পরিবর্তন করে ৩১ অক্টোবর করা হয়েছে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অধিকার ও উৎসবের প্রতি সহানুভূতি এবং সহযোগিতা দেখানো নাগরিক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সভা ও প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল, যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলের পরিচালক মো. মোবারক হোসাইন, এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল আলামিন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বিডিপির মহাসচিব নিজামুল হক নাঈমসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবেদকের নাম 


























