রংপুরে ৩১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটি প্রায় সাত বছরেও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। আধুনিক ভবন, অপারেশন থিয়েটার, ওয়ার্ড, কেবিন, ল্যাব ও অক্সিজেন প্লান্টসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও চিকিৎসক-নার্স, অন্যান্য জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে এখনো সীমিত পরিসরে চলছে এর কার্যক্রম।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর সিটি করপোরেশনের সামনে সদর হাসপাতালের এক একর ৭৮ শতাংশ জমিতে উত্তরবঙ্গের প্রথম সরকারি ১০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩১ কোটি ৪৮ লাখ ৯২ হাজার ৮০৯ টাকা।
দুই বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের প্রায় আড়াই মাস আগেই ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ভবনের কাজ শেষ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২০ সালের ৮ মার্চ হাসপাতাল ভবনটি সিভিল সার্জনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তবে ওই বছর দেশে করোনা মহামারি শুরু হলে হাসপাতালটি করোনা রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। ২০২০ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে সেখানে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া শুরু হয়। এতে শিশু হাসপাতালের মূল কার্যক্রম পিছিয়ে যায়।
পরে ২০২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালটির উদ্বোধন করেন। তবে প্রশাসনিক অনুমোদন, প্রয়োজনীয় জনবল ও অর্থ বরাদ্দ ছাড়াই উদ্বোধন হওয়ায় এরপরও পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি।
৬৫৯ জনবল চেয়ে প্রস্তাব
হাসপাতাল পরিচালনার জন্য ৬৫৯ জনবল নিয়োগের প্রস্তাব করে ২০২৩ সালের ৫ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এতে হাসপাতাল পরিচালনায় বছরে ৪৬ কোটি ৫৬ লাখ ৩ হাজার ৬৩৮ টাকা ব্যয়ের কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন হয়নি।
২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি শিশু হাসপাতালে অস্থায়ীভাবে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের বর্ধিত শিশু বহির্বিভাগ চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ১৫ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালের নিচতলার তিনটি কক্ষে বহির্বিভাগ চালু করা হয়। সেখানে রোগী ভর্তির সুযোগ নেই।
গত ১ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখার অতিরিক্ত সচিব আরিফ আহমদ হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন। তিনি জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরের মধ্যে শিশু হাসপাতালগুলো চালুর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র কেনা এবং জনবল নিয়োগের কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ২০৭ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও জানান তিনি।
তবে সেপ্টেম্বর পেরিয়ে অক্টোবর শুরু হলেও রংপুরের হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম আসেনি। চিকিৎসক-নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবলও পদায়ন হয়নি। সম্প্রতি তিন গাড়ি আসবাবপত্র হাসপাতালে এসেছে বলে জানিয়েছে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতর।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, আসবাবপত্র হাসপাতালে ঢোকানো শেষ হলে তা বুঝিয়ে দেওয়া হবে। তবে চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি কবে আসবে এবং হাসপাতাল কবে চালু হবে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
অবকাঠামো থাকলেও অব্যবহৃত অধিকাংশ কক্ষ
তিনতলা মূল হাসপাতাল ভবনের প্রতিটি তলার আয়তন ২০ হাজার ৮৮২ দশমিক ৯৭ বর্গফুট। এখানে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, চিকিৎসকদের চেম্বার ও ল্যাব, অপারেশন থিয়েটার, ব্রোন ইউনিট, ওয়ার্ড ও কেবিনের ব্যবস্থা রয়েছে।
এ ছাড়া সুপারিনটেনডেন্ট কোয়ার্টার, চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফদের আবাসিক ভবন, গ্যারেজ কাম ড্রাইভার কোয়ার্টার এবং বিদ্যুৎ সাবস্টেশনও নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ কক্ষ বর্তমানে অব্যবহৃত পড়ে আছে।
হাসপাতালে বর্তমানে একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা ও চারজন কনসালট্যান্ট প্রেষণে সংযুক্ত রয়েছেন। প্রতিদিন একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা ও একজন কনসালট্যান্ট সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত রোগী দেখেন। তবে অন্তর্বিভাগ চালু না থাকায় শিশুদের ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ নেই।
রমেকে বাড়ছে শিশু রোগীর চাপ
শিশু হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায় রংপুর বিভাগের শিশু রোগীদের বড় একটি অংশের চিকিৎসার চাপ পড়ছে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর। সেখানে শিশুদের জন্য ১০৮টি শয্যা থাকলেও প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ শিশু ভর্তি থাকে। শয্যা সংকটে অনেক শিশুকে বারান্দা ও মেঝেতেও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জোসনা বেগম বলেন, এ অঞ্চলের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের চিকিৎসার বড় ভরসা রমেক হাসপাতাল। কিন্তু সেখানে সবসময় রোগীর চাপ থাকায় অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটি চালু হলে স্বল্প খরচে শিশুদের উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতো।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, রোগীর চাপে রমেক হাসপাতালের পরিস্থিতি নাজুক। শিশু ওয়ার্ডেও একই অবস্থা। শিশুদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত হাসপাতালটি দ্রুত চালু করার দাবি জানান তিনি।
প্রতিবেদকের নাম 
























