
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিংবা অন্য কোনোভাবে অর্জিত যৌথ সম্পত্তি নিয়ে শরিকদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হওয়া নতুন কিছু নয়। অনেক সময় একাধিক মালিকের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় নিজের প্রাপ্য অংশ বুঝে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে আইনের আশ্রয় নিয়ে সম্পত্তির ন্যায্য হিস্যা বুঝে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য দেওয়ানি আদালতে করা যায় বাটোয়ারা মামলা, যা পার্টিশন স্যুট নামেও পরিচিত।
আইনজীবী এম টি উল্যাহর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যৌথ সম্পত্তির শরিকদের মধ্যে আপসের মাধ্যমে ভাগ-বণ্টন সম্ভব না হলে যেকোনো একজন শরিক আদালতে বাটোয়ারা মামলা করতে পারেন। তবে এ ধরনের মামলা করার আগে সম্পত্তির মালিকানা ও প্রত্যেক শরিকের অংশ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
বাটোয়ারা মামলা করতে যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন
বাটোয়ারা মামলা করার আগে সম্পত্তির মালিকানা ও উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- ভূমি জরিপের খতিয়ান।
- নামজারি খতিয়ান।
- জমির মালিকানার দলিল।
- উত্তরাধিকার সনদ।
- জমির দাগ নম্বর ও পরিমাণসংক্রান্ত তথ্য।
এসব নথির মাধ্যমে সম্পত্তিতে কার কতটুকু মালিকানা রয়েছে, তা নির্ধারণ করা সহজ হয়। পাশাপাশি মামলার ক্ষেত্রে সব সহশরিককে পক্ষভুক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শরিককে বাদ দেওয়া হলে পরবর্তী সময়ে সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বণ্টননামা দলিল কীভাবে তৈরি হয়
যৌথ সম্পত্তির মালিকেরা নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সম্পত্তি ভাগ করে নিলে সেই ভাগ-বণ্টনের লিখিত দলিলকে বণ্টননামা বলা হয়।
এ দলিলে প্রত্যেক শরিকের প্রাপ্য অংশ, জমির পরিমাণ এবং সীমানা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়। জমি পরিমাপ করে কার ভাগে কোন অংশ পড়বে, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সব শরিকের সম্মতি ও স্বাক্ষর থাকতে হবে।
আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধ করে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন করতে হয়।
বণ্টননামা নিবন্ধনে কত খরচ হয়
আপসের মাধ্যমে যৌথ সম্পত্তি ভাগ করার ক্ষেত্রে বণ্টননামা দলিল তৈরি করে নিবন্ধন করা প্রয়োজন। নিবন্ধন (সংশোধন) আইন, ২০০৪-এর ১৭(১) ধারার বিধান অনুযায়ী বণ্টননামা নিবন্ধন বাধ্যতামূলক বলে জানিয়েছেন আইনজীবী এম টি উল্যাহ।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দলিলে উল্লেখ করা জমির মূল্যের ওপর ২ শতাংশ হারে স্ট্যাম্প খরচ প্রযোজ্য। এর পাশাপাশি অন্যান্য নিবন্ধন ফিও দিতে হয়।
তবে সরকারি শুল্ক ও ফি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই দলিল নিবন্ধনের আগে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সর্বশেষ খরচের তথ্য জেনে নেওয়া উচিত।
বাটোয়ারা মামলায় আদালতের দুই ধরনের ডিক্রি
বাটোয়ারা মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আদালত সাধারণত দুই ধাপে ডিক্রি দিয়ে থাকেন।
১. প্রাথমিক ডিক্রি: মামলার প্রথম পর্যায়ে আদালত প্রত্যেক শরিকের মালিকানার অংশ বা হিস্যা নির্ধারণ করেন। কার কতটুকু সম্পত্তিতে অধিকার রয়েছে, তা এই ডিক্রিতে উল্লেখ থাকে।
২. চূড়ান্ত ডিক্রি: প্রাথমিক ডিক্রির পর জমির প্রকৃত অবস্থান ও সীমানা নির্ধারণের জন্য আদালত প্রয়োজন অনুযায়ী আমিন বা কমিশনার নিয়োগ করতে পারেন। তাঁরা সরেজমিনে জমি পরিমাপ করে প্রত্যেক শরিকের প্রাপ্য অংশ চিহ্নিত করেন। এরপর আদালত চূড়ান্ত ডিক্রি দেন। প্রয়োজনে সম্পত্তির দখল বুঝিয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তাও নেওয়া যেতে পারে।
সম্পত্তি ভাগ হওয়ার পর যে কাজগুলো করবেন
আদালতের মাধ্যমে কিংবা শরিকদের পারস্পরিক সমঝোতায় সম্পত্তি ভাগ-বণ্টন সম্পন্ন হলে নিজের নামে প্রয়োজনীয় ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক শরিকের উচিত নিজের অংশ অনুযায়ী নামজারি ও জমাভাগ সম্পন্ন করা। পাশাপাশি নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে হবে।
নামজারির মাধ্যমে সরকারি ভূমি রেকর্ডে নিজের নামে জমির তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এতে ভবিষ্যতে জমির মালিকানা, ভোগদখল ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিরোধ বা আইনি জটিলতা কমাতে সহায়তা করে।
তাই যৌথ সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে পারিবারিক সমঝোতার চেষ্টা করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা এবং আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদকের নাম 




















