অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের সময় অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এতে কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এনওয়াইইউ ল্যাঙ্গোন হেলথ, সিটি অব হোপ এবং মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টারের গবেষকেরা এ গবেষণা পরিচালনা করেন। এতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত ১৭৩ জন রোগীর ৯ হাজার ৪১৯টি খাবারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। পাশাপাশি পর্যবেক্ষণ করা হয় তাঁদের অন্ত্রের জীবাণুসমাজের পরিবর্তন।
গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা শুরুর আগের ৪৮ ঘণ্টায় প্রতি অতিরিক্ত ১০০ গ্রাম চিনি গ্রহণের সঙ্গে অন্ত্রের জীবাণুর বৈচিত্র্য আরও ২১ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। অন্ত্রে বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ও বৈচিত্র্য পরিমাপের একটি সূচক হলো ‘আলফা ডাইভারসিটি’।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটিতে আরও দেখা গেছে, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সমন্বয়ের সঙ্গে Enterococcus faecium নামের একটি ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। এই ব্যাকটেরিয়া কিছু গুরুতর ও চিকিৎসা করা কঠিন সংক্রমণের কারণ হতে পারে।
ইঁদুরের ওপর পরীক্ষাতেও মিলেছে একই প্রবণতা
গবেষকেরা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়েও একই ধরনের প্রবণতা দেখতে পেয়েছেন। পরীক্ষায় অ্যান্টিবায়োটিক বায়াপেনেমের পাশাপাশি সুক্রোজযুক্ত খাবার গ্রহণকারী ইঁদুরের অন্ত্রে তৃতীয় দিনে এন্টারোকক্কাস ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা ১৬ দশমিক ৩ গুণ বেড়ে যায়। ষষ্ঠ দিনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ দশমিক ৪ গুণে।
গবেষণার সহপ্রধান লেখক ও এনওয়াইইউ ল্যাঙ্গোনের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জোনাস শ্লুটার বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে অন্ত্রের জীবাণুসমাজে যে ক্ষতি হয়, তার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। এসব ঝুঁকি কমানোর উপায় খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
গবেষকদের মতে, অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের সময় এবং পরবর্তী সময়ে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, বিশেষ করে অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার কমানো, অন্ত্রের জীবাণুসমাজের ক্ষতি সীমিত রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
রক্তের ক্যানসারে আক্রান্তদের কেন বেছে নেওয়া হলো
গবেষণায় রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, কারণ তাঁদের অনেককেই নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক নিতে হয়। হাসপাতালে অবস্থানকালে তাঁদের খাবারের হিসাব রাখা এবং অন্ত্রের জীবাণুর নমুনা সংগ্রহ করাও তুলনামূলকভাবে সহজ।
ক্যানসারের চিকিৎসা, বিশেষ করে স্টেম সেল প্রতিস্থাপন ও নিবিড় অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার সময় অন্ত্রের জীবাণুসমাজে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটতে পারে। উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য কমে গেলে Enterococcus faecium-এর মতো সম্ভাব্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তারের সুযোগ বাড়তে পারে।
গবেষণার সহপ্রধান লেখক ও সিটি অব হোপের প্রধান চিকিৎসা নির্বাহী মার্সেল ভ্যান ডেন ব্রিংক বলেন, ক্যানসারের চিকিৎসায় অন্ত্রের জীবাণুসমাজের গুরুত্ব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে অস্থিমজ্জা বা স্টেম সেল প্রতিস্থাপন করা রোগীদের ক্ষেত্রে এসব জীবাণুর পরিবর্তন চিকিৎসার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসায় কী প্রভাব পড়তে পারে
গবেষণার আরেক সহপ্রধান লেখক ও মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টারের চিকিৎসক জোনাথন পেলেডের মতে, রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে অন্ত্রের জীবাণুসমাজের ক্ষতির সঙ্গে বিভিন্ন সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। খাদ্যাভ্যাসে স্বল্পমেয়াদি পরিবর্তন তাঁদের চিকিৎসার ফলাফল উন্নত করতে পারে কি না, তা জানতে ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন।
গবেষকদের ধারণা, অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পরও টিকে থাকা কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া খাদ্য থেকে পাওয়া চিনি ব্যবহার করে দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। তবে চিনি সরাসরি এসব ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, নাকি উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে তাদের প্রতিযোগিতাকে দুর্বল করে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
কী বলছেন গবেষকেরা
গবেষকেরা বলছেন, অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের সময় ও পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ কমানো অন্ত্রের জীবাণুসমাজের ক্ষতি সীমিত রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে খাদ্যাভ্যাসের এই পরিবর্তন সংক্রমণের ঝুঁকি কমায় কিংবা চিকিৎসার ফলাফল উন্নত করে কি না, তা এখনো প্রমাণিত হয়নি।
এ গবেষণার ফলাফল থেকে সবার ক্ষেত্রে চিনি খাওয়া বন্ধ করা বা খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে ক্যানসারে আক্রান্ত বা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: সায়েন্সডেইলি, নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা।
প্রতিবেদকের নাম 

























