ফেসবুকে পরিচয়ের পর কক্সবাজারে গিয়ে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে একটি আবাসিক হোটেলে উঠেছিলেন কুমিল্লায় ধর্ষণ ও হত্যার শিকার স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন (১৫)। হোটেলের রেজিস্টারে তাঁকে ‘রাজুর স্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেখানে তাঁর নাম লেখা হয়েছিল ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স দেখানো হয়েছিল ১৮ বছর।
বাংলাদেশ টাইমসের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার কুটুমবাড়ি রোডের শেষ মাথায় অবস্থিত মেঘলা রিসোর্টের ৩০২ নম্বর কক্ষে ওঠেন তাজমিন ও রাজু। পরদিন ৭ অক্টোবর হোটেল ছেড়ে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হন তাজমিন। তবে বাড়ি ফেরার পথে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন তিনি।
হোটেলের রেজিস্টারে নাম ও বয়স পরিবর্তনের তথ্য
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোটেলের রেজিস্টারে তাজমিনের নাম ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স ১৮ বছর লেখা হয়েছিল। সেখানে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর পরিচয়ও নথিভুক্ত করা হয়।
হোটেলের এক কর্মচারীর বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এক রাত থাকার পর ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তাঁরা হোটেল ছেড়ে চলে যান। হোটেলের রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে তাঁদের অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
১৭ দিনের পরিচয়, নাকি আরও আগে যোগাযোগ?
রাজুর সঙ্গে তাজমিনের পরিচয়ের সময়কাল নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। রাজুর এক সহকর্মীর দাবি, ফেসবুকে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল প্রায় ১৭ দিন আগে। তবে রাজুর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি, তাঁদের প্রথম পরিচয় হয়েছিল প্রায় পাঁচ মাস আগে। ফেসবুকের পাশাপাশি ইনস্টাগ্রামেও তাঁদের যোগাযোগ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কক্সবাজার যাওয়ার আগে তাজমিনের সঙ্গে রাজুর নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদান হতো। তাজমিনকে কক্সবাজারে যাওয়ার জন্য বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা পাঠানোর তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বাসে তুলে দেন রাজু
কক্সবাজারের একটি ট্রাভেল এজেন্সির প্রতিনিধির বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজু তাজমিনের জন্য আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসের টিকিট বুক করেছিলেন। টিকিটের দাম ছিল ৯০০ টাকা। ৭ অক্টোবর দুপুরে তাজমিনকে কুমিল্লাগামী বাসে তুলে দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সিসিটিভি ফুটেজের বরাতে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওই দিন রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা বাস থেকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে নামেন তাজমিন। এরপর শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন তিনি।
কিন্তু সেই যাত্রায় আর বাড়ি ফেরা হয়নি তাঁর।
অটোরিকশাচালকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় ফেরার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া (৩৫) তাজমিনকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার একটি ধানখেত থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মেয়েকে খুঁজতে চেয়েছিলেন মা
পরিবারের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাজমিন মাকে জানিয়েছিলেন, তিনি এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছেন। তবে বান্ধবীর পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে বিস্তারিত জানাননি।
তাজমিনের মা কেয়া খাতুনের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল ৮ অক্টোবর। তখন তাজমিন জানিয়েছিলেন, তিনি এক বান্ধবীর সঙ্গে আছেন। মেয়েকে সেখান থেকে নিয়ে আসতে চাইলেও তাঁর অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাননি মা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তাজমিনের মনোমালিন্য হয়। এরপর তিনি বাড়ি থেকে বের হন। প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাওয়ার পর রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
তদন্ত চলছে, বলছে পুলিশ
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমানের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাজমিনের মুঠোফোনের কললিস্টসহ অন্যান্য বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে ঘটনার বাকি তথ্য জানা যাবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রা, রাজুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং বাড়ি ফেরার পথে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড—সবকিছু ঘিরে তদন্তের স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের অনলাইন পরিচয়, নিরাপত্তা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়েও ঘটনাটি নতুন করে সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদকের নাম 






















