বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ায় অপরিণত শিশুর জন্মের হার বেশি। এর সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধানে নতুন একটি গবেষণায় নির্দিষ্ট জিনগত বৈশিষ্ট্যের ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, গর্ভাবস্থায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের একটি উপাদান ডকোসাহেক্সায়েনয়িক অ্যাসিড (ডিএইচএ) গ্রহণের মাত্রাও অপরিণত সন্তান জন্মের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
প্লোস মেডিসিন সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিনের বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতার কারণে গর্ভাবস্থায় ডিএইচএর প্রয়োজনীয়তা একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে।
গবেষণায় কী উঠে এসেছে?
গবেষকেরা এমন একটি জিনগত ভিন্নতা শনাক্ত করেছেন, যা গর্ভাবস্থার ৩৪ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে সন্তান জন্মের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শরীরে ডিএইচএর চাহিদা ও বিপাকপ্রক্রিয়ার ভূমিকা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষণার জন্য প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ হাজার ৪৮৭ জন নারীকে যাচাই করা হয়। পরে ৭৬১ জন গর্ভবতী নারীর জিনগত বৈশিষ্ট্য ও গর্ভাবস্থাসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাঁদের দৈবচয়নের ভিত্তিতে দুটি দলে ভাগ করে এক দলকে প্রতিদিন ২০০ মিলিগ্রাম এবং অন্য দলকে ১ হাজার মিলিগ্রাম ডিএইচএ গ্রহণ করতে দেওয়া হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট জিনগত ভিন্নতার অন্তত একটি অনুলিপি বহনকারী নারীদের মধ্যে প্রতিদিন ২০০ মিলিগ্রাম ডিএইচএ গ্রহণকারী দলের অপরিণত জন্মের হার ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে, প্রতিদিন ১ হাজার মিলিগ্রাম গ্রহণকারী দলের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ১ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ, এই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীতে বেশি মাত্রায় ডিএইচএ গ্রহণের সঙ্গে গর্ভাবস্থার ৩৪ সপ্তাহের আগে সন্তান জন্মের ঝুঁকি প্রায় ৭৫ শতাংশ কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে যেসব নারীর মধ্যে ওই জিনগত ভিন্নতা ছিল না, তাঁদের ক্ষেত্রে বেশি মাত্রায় ডিএইচএ গ্রহণের সঙ্গে গর্ভাবস্থা ৪০ সপ্তাহের পর পর্যন্ত চলার সম্ভাবনা বৃদ্ধির সম্পর্ক দেখা গেছে।
গবেষকদের মতে, ফলাফলগুলো ইঙ্গিত দেয় যে গর্ভাবস্থায় সবার ডিএইচএর চাহিদা সমান নাও হতে পারে। কোন নারীরা বেশি মাত্রায় এ পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে উপকৃত হতে পারেন, তা বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।
জিনগত বৈশিষ্ট্য কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে?
গবেষণায় চিহ্নিত জিনগত ভিন্নতাটি ফ্যাটি অ্যাসিড ডেস্যাচুরেজ জিনের সঙ্গে সম্পর্কিত। শরীরে অ্যারাকিডোনিক অ্যাসিড (এআরএ) তৈরির প্রক্রিয়ায় এই জিনগুলো ভূমিকা রাখে। এআরএ হলো ওমেগা-৬ শ্রেণির একটি ফ্যাটি অ্যাসিড।
এই ফ্যাটি অ্যাসিড প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন ই২ নামের হরমোনসদৃশ পদার্থ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। পদার্থটি প্রসব শুরু হওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং শরীরের প্রদাহ-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমেও অংশ নেয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট জিনগত ভিন্নতার একটি সংস্করণ বহনকারী নারীদের শরীরে তুলনামূলক বেশি এআরএ তৈরির প্রবণতা থাকতে পারে। অন্যদিকে, তৈলাক্ত মাছ ও মাছের তেলে পাওয়া ডিএইচএ এআরএর কিছু প্রভাবের বিপরীতে কাজ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডিএইচএ কি অপরিণত জন্ম প্রতিরোধে কার্যকর?
ডিএইচএ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন। যুক্তরাষ্ট্রে গর্ভবতী নারীদের জন্য ব্যবহৃত কিছু পুষ্টিপূরক এবং শিশুখাদ্যে এ উপাদান রয়েছে। তবে অপরিণত সন্তান জন্ম প্রতিরোধে ডিএইচএর নির্দিষ্ট মাত্রার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
এ গবেষণার ফলাফল থেকে সব গর্ভবতী নারীর জন্য বেশি মাত্রায় ডিএইচএ গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া যায় না। বিশেষ করে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের ক্ষেত্রে একই ফল প্রযোজ্য কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও তথ্য প্রয়োজন। গর্ভাবস্থায় কোনো পুষ্টিপূরক গ্রহণের মাত্রা পরিবর্তনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্রতিবেদকের নাম 























