বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের অর্জন যেন কোনোভাবেই বৃথা না যায়। এ জন্য তরুণ প্রজন্মকে দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি মাঠে ‘কবীর-লালন ভাবসংগীত উৎসব’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
‘মুক্তিযুদ্ধ বৃথা গেলে পূর্বপুরুষরা অভিশাপ দেবেন’
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে ফজলুর রহমান বলেন, “এখন যারা তরুণ প্রজন্ম, তাদের কাছে আমি হাত জোড় করে বলি—মুক্তিযুদ্ধ যেন বৃথা না যায়। তাহলে আমাদের সমস্ত পূর্বপুরুষ আমাদের অভিশাপ দেবেন।”
তিনি বলেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে কেউ অপরাধ করতে পারে, লুটপাট করতে পারে কিংবা ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় মুক্তিযুদ্ধের ওপর বর্তায় না।
সংস্কৃতির অন্ধকার নিয়ে উদ্বেগ
বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে নিজেকে অসহায় ও লজ্জিত মনে হচ্ছে উল্লেখ করে ফজলুর রহমান বলেন, “অন্ধকারে ডুবে গেছে বাংলার সংস্কৃতি।”
তিনি বলেন, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা, কুশিয়ারাসহ বাংলার শত শত নদীর তীরে হাজার বছর ধরে যে সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেই সংস্কৃতির লালন-পালনের মধ্য দিয়েই বাঙালি সভ্যতা অর্জন করেছে। অথচ আজ সেই সংস্কৃতি যেন অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে।
‘কবীর-লালন ভাবসংগীত উৎসব’-এর আয়োজনকে এই অন্ধকারে একটি ছোট প্রদীপের সঙ্গে তুলনা করেন তিনি। ফজলুর রহমান বলেন, একটি অন্ধকার রাতে নিভু নিভু প্রদীপ যেমন সামান্য একটি জায়গাকে আলোকিত করে, তেমনি এই আয়োজনও হয়তো বাংলার বাঙালি সংস্কৃতির ওপর নেমে আসা অন্ধকার কিছুটা হলেও দূর করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, “বড় সাহস করে আজ বাংলাদেশে সত্য কথা বলতে হয়। অথচ স্রষ্টা আমাদের পাঠিয়েছেন সত্য কথা বলার জন্য।”
সৌদি আরবের উদাহরণ টেনে সংস্কৃতি চর্চার আহ্বান
বক্তব্যে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের উদাহরণও তুলে ধরেন ফজলুর রহমান।
তিনি বলেন, শত শত বছর ধরে যে সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা-মদিনায় মানুষ হজ পালন করতে যায়, সেই দেশেও এখন সংস্কৃতির নবজাগরণের কাব্য রচিত হচ্ছে। ঘরে ঘরে আধুনিকতার আলো পৌঁছাচ্ছে। নারীরা ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন, খেলাধুলা করছেন, খেলা দেখতে যাচ্ছেন এবং গাড়ি চালাচ্ছেন।
তার ভাষ্য, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সৌদি আরবও আজ অনেক বেশি আলোকিত হয়ে উঠছে। অথচ বাংলাদেশে সংস্কৃতির দরজা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে মানুষের অন্তর ও আত্মা—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আট বিভাগে মাসব্যাপী ‘কবীর-লালন’ উৎসব
ফকির লালন শাহের বাণী—‘ভক্ত কবীর জাতে জোলা প্রেমভক্তিতে মাতোয়ালা, ধরেছে সে ব্রজের কালা দিয়ে সর্বস্ব ধন তাই’—শীর্ষক ভাবধারাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে শুরু হয়েছে আট বিভাগব্যাপী ‘কবীর-লালন ভাবসংগীত উৎসব’।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এবং লালন বিশ্বসংঘের আয়োজনে দেশের আট বিভাগে মাসব্যাপী এ উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে সন্ত কবীর ও লালন ফকিরের দর্শন, ভাবধারা ও সংগীতের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
ধর্মের নামে বিভাজনের সমালোচনা
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, যারা ধর্মের নামে ব্যবসা করে, তারাই মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে।
ভারতের সাধক কবি সন্ত কবীর ও বাংলাদেশের সাধক কবি লালনের জীবনাদর্শ তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো ধর্মেই মানুষের মধ্যে বিভাজনের কথা বলা হয়নি। যুগে যুগে কিছু মানুষ বিভাজন তৈরির চেষ্টা করেছে।
শান্তির পথ প্রতিষ্ঠা করতে অনেক লড়াই করতে হয় উল্লেখ করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনায় কবীর-লালনের দর্শন
লালন বিশ্বসংঘের চেয়ারম্যান প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে কবীর-লালনের ভাবসংগীত ও দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রিয়াঙ্কা গোপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আহসানুল হাদী, লালনপন্থী সাধক ফকির আবুল হোসেন শাহ, কবীরপন্থী সাধক নিঝুম পাইনকা, গুরুদুয়ারা নানকশাহীর ডা. এম কে রায় এবং গবেষক সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান।
স্বাগত বক্তব্য দেন লালন বিশ্বসংঘের নির্বাহী পরিচালক আবদেল মাননান।
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিল্পীদের সংগীত পরিবেশনা
উৎসবের দ্বিতীয় পর্বে কবীর-লালনের সংগীত পরিবেশন করেন মৌলভীবাজার থেকে আসা কবীরপন্থী সম্প্রদায়ের শিল্পীরা। এ ছাড়া ঢাকার রবিদাসপন্থী সম্প্রদায়, নানকপন্থী শিখ সম্প্রদায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিল্পী এবং কবীর-লালন মিউজিক্যাল মিশনের শিল্পীরাও সংগীত পরিবেশন করেন।
ঢাকায় উদ্বোধনের পর পর্যায়ক্রমে বরিশাল, খুলনা, শেরপুর (ময়মনসিংহ বিভাগ), রাজশাহী, রংপুর ও চট্টগ্রামে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হবে।
মাসব্যাপী এ আয়োজনের সমাপনী পর্ব আগামী ৩০ অক্টোবর শ্রীমঙ্গলে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সিলেট বিভাগে শেষ হবে ‘কবীর-লালন ভাবসংগীত উৎসব’।
প্রতিবেদকের নাম 




















