ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব এল-মানদেব প্রণালীর কৌশলগত পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। পরপর এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে পাইপলাইনটিতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। হামলার পর স্যাটেলাইট ছবিতে ওই এলাকায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে।
বিশ্ব তেল সরবরাহে প্রভাবের আশঙ্কা
প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৌদির ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইন দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ পরিবহন করা হয়। ফলে পাইপলাইনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। লোহিত সাগরে চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার সঙ্গে সৌদির গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোতে হামলার ঘটনা বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
ইরাকের মায়সান থেকে হামলার অভিযোগ
বাগদাদ ও রিয়াদ—দুই পক্ষের তথ্য অনুযায়ী, হামলাটি দক্ষিণ-পূর্ব ইরাকের মায়সান প্রদেশ থেকে চালানো হয়েছে। ওই এলাকায় ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে বলে জানা যায়।
ঘটনার পর ইরাক সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। মায়সান অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ইরান-ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ শালামচেহ সীমান্ত ক্রসিংও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধের পর সৌদি আরব আপাতত সরাসরি পাল্টা হামলা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার রিয়াদ সংরক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে।
হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন সহায়তা চেয়েছেন সৌদি যুবরাজ
পরিস্থিতি ঘনীভূত হওয়ার মধ্যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে কথা বলেছেন। এসব আলোচনায় ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে সরাসরি মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই মুহূর্তে সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা নেই যুক্তরাষ্ট্রের। যদিও সৌদি আরবকে প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে তারা।
এদিকে যুদ্ধ ও হামলার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রেও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরের কংগ্রেসীয় নির্বাচন সামনে রেখে তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পেরিম দ্বীপে হুথিদের নিয়ন্ত্রণের দাবি
এরই মধ্যে বাব এল-মানদেব প্রণালীর কৌশলগত পেরিম দ্বীপ এবং লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে হুথিরা। ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সহায়তায় তারা ওই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ইয়েমেন সরকার কৌশলগত এসব এলাকা পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের পাল্টা অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। এর ফলে লোহিত সাগর ও বাব এল-মানদেব ঘিরে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে হুথিদের কোনো সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সৌদি আরব ও লোহিত সাগর এলাকায় হামলা জোরদার করতে হুথিদের আরও অস্ত্র, অর্থ ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তেহরান।
সব মিলিয়ে সৌদির গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোতে হামলা, বাব এল-মানদেবের কৌশলগত অবস্থানে হুথিদের তৎপরতা এবং আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা—এই তিনটি বিষয়ই এখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদকের নাম 




















