ঢাকা ০৬:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
টিকাদানে ঘাটতিতে ভয়াবহ রূপ, বিশ্বের সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে ক্যাশলেস লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়বে, কমবে দুর্নীতির সুযোগ: অর্থমন্ত্রী ইতালিতে বাঁধনের ওপর হামলা: ভিডিও বিশ্লেষণে কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত চবিতে ব্যানার টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, প্রাণ গেল শিক্ষার্থীর ময়লা ফেলার প্রতিবাদ করায় চারজনকে কুপিয়ে জখম সন্ধ্যা নামলেই বদলে যায় কানাইপুকুর, হাজারো পাখির কলকাকলিতে মুখর গ্রাম বরিশালে ময়লার স্তূপ থেকে দুই নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার ২০৩০ সালে ৫৫০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্য, গ্রিডের বাইরে থাকবে সংসদ চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার বিরোধিতা আনু মুহাম্মদের মেঘ-বৃষ্টির আভাস ঢাকায়, কাটছে না ভ্যাপসা গরম
বিজ্ঞাপন:
📰 Dainikbishawsongbad.com— দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ খবর, ব্রেকিং নিউজ, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন, আন্তর্জাতিক সংবাদ ও গুরুত্বপূর্ণ সকল আপডেট পেতে প্রতিদিন ভিজিট করুন 🌍 নির্ভরযোগ্য ও দ্রুত সংবাদ পরিবেশনে আমরা সবসময় আপনার পাশে। 📢 আপনার ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য ব্যানার বিজ্ঞাপন ও স্পন্সর পোস্ট সুবিধা রয়েছে। 🌐 DainikBishwaSongbad.com

মগড়া নদী কি টিকে থাকবে, নাকি হারিয়ে যাবে মানুষের অবহেলায়?

  • প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেটের সময়: ০৯:৩৪:১৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১৩ সময় দেখুন

নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেজারার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় দুই বছর ধরে এই শহরের সঙ্গে আমার প্রতিদিনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। শহরটিকে চিনেছি তার রাস্তা, মানুষ, বাজার আর ঋতুর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। তবে সবচেয়ে বেশি চিনেছি মগড়া নদীকে দেখে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে প্রতিদিন অন্তত দুবার আমাকে মগড়া পার হতে হয়। কখনো রিকশায়, কখনো গাড়িতে। এতবার একটি নদী পার হতে হতে একসময় নদীটি আর শুধু পথের পাশের কোনো দৃশ্য থাকে না; অজান্তেই সে দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে যায়। দিনের আলো বদলের সঙ্গে তার রং বদলাতে দেখি। বর্ষায় তাকে দেখি একভাবে, শুষ্ক মৌসুমে আরেকভাবে।

কখনো রিকশা থেকে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি, কখনো ব্যস্ততার মধ্যে শুধু একঝলক চোখ পড়ে। কিন্তু এই নিয়মিত দেখার মধ্যেই ধীরে ধীরে একটি অস্বস্তি জন্মেছে। দেখেছি, একটি নদী কীভাবে মানুষের হাতেই একটু একটু করে আহত হয়।

নদীর কাছ থেকে সবকিছু চাই, ফিরিয়ে দিই বর্জ্য

যে নদীর তীরে মানুষ ঘর বানিয়েছে, দোকান বানিয়েছে, ব্যবসাকেন্দ্র গড়ে তুলেছে, যে নদীর উপস্থিতি একটি শহরকে বসবাসযোগ্য করেছে, সেই নদীর দিকেই আমরা অবলীলায় ছুড়ে দিচ্ছি আমাদের বর্জ্য।

নর্দমার পানি গিয়ে পড়ছে নদীতে। কোথাও ময়লা জমছে, কোথাও তীর সংকুচিত হচ্ছে। নদীকে প্রতিদিন ব্যবহার করছি, কিন্তু নদীর প্রতিও যে আমাদের কোনো দায় আছে—সেই কথাটি যেন ক্রমেই ভুলে যাচ্ছি।

মগড়া অন্য অনেক নদীর মতো নয়। নেত্রকোণায় এসে নদীটির সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য মনে হয়েছে তার চলার ভঙ্গি। সাপের মতো এঁকেবেঁকে সে এই অঞ্চল দিয়ে বয়ে গেছে। নেত্রকোণা শহরটিকেও সে যেন একবার ছুঁয়ে চলে যায়নি; ঘুরে-পেঁচিয়ে বারবার শহরের কাছে ফিরে এসেছে।

কোথাও রাস্তার পাশে, কোথাও বসতির গা ঘেঁষে, কোথাও বাজারের কাছে—মগড়া যেন শহরের শরীরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত একটি শিরা। সম্ভবত সে কারণেই নেত্রকোণার দৈনন্দিন জীবন থেকে মগড়াকে আলাদা করে ভাবা কঠিন।

শুধু একটি নদী নয়, বড় জলপ্রবাহ ব্যবস্থার অংশ

এ অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস, জীবিকা, কৃষি, মাছ ও জলাভূমির সঙ্গে নদীটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মগড়া শুধু নেত্রকোণা শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি জলধারা নয়। নদীটি আটপাড়ার কৃষিভূমি, আশপাশের খাল-বিল এবং বৃহত্তর হাওর অঞ্চলের জলপ্রবাহের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বর্ষা এলে নদী, খাল, বিল ও প্লাবনভূমি আলাদা আলাদা ভূখণ্ড থাকে না। পানি তাদের একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে। মাছ চলাচল করে, পলি যায়, জলজ উদ্ভিদ ছড়িয়ে পড়ে, কৃষিজমি পানি পায়। প্রকৃতির এই সম্পর্কগুলো খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু অত্যন্ত গভীর।

আমরা শহরে বসে কখনো কখনো একটি নদীকে শুধু তার দৃশ্যমান অংশ দিয়ে বিচার করি। মনে করি, আমার বাড়ির পাশ দিয়ে যে অংশটুকু গেছে, সেটুকুই নদী। কিন্তু নদীর জীবন আমাদের চোখে দেখা সীমানার চেয়ে অনেক বড়।

আরও পড়ুনঃ  কৃষি গুচ্ছের ভর্তি পরীক্ষা ২ জানুয়ারি, নেতৃত্বে শেকৃবি

মগড়ার পানি খাল দিয়ে বিলে যায়, প্লাবনভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে, আবার পানি কমলে সেই জল বৃহত্তর নদীব্যবস্থায় ফিরে আসে। অর্থাৎ মগড়াকে আঘাত করলে তার প্রভাব শুধু শহরের কয়েক কিলোমিটার নদীতে সীমাবদ্ধ থাকে না।

নদীর মৃত্যুও ঘটে ধীরে ধীরে

কিছুদিন আগে বিখ্যাত প্রকৃতিবিদ ও প্রাকৃতিক ইতিহাসের লেখক ডেভিড অ্যাটেনবোরোর A Life on Our Planet দেখছিলাম। ডকুমেন্টারিটিকে তিনি নিজের ‘witness statement’ বা সাক্ষ্য হিসেবে নির্মাণ করেছেন।

প্রায় এক শতাব্দীর জীবনে তিনি পৃথিবীর যে রূপ দেখেছেন এবং মানুষের কর্মকাণ্ডে সেই পৃথিবীকে যেভাবে বদলে যেতে দেখেছেন, তারই এক গভীর ব্যক্তিগত বিবরণ এটি।

অ্যাটেনবোরো যখন তার যৌবনের পৃথিবীর কথা বলেন—অরণ্যের বিস্তার, প্রাণবৈচিত্র্যের প্রাচুর্য, প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য—তারপর দেখান কয়েক দশকের মধ্যেই মানুষ কী দ্রুত সেই পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে, তখন একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে আসে।

পৃথিবীকে ধ্বংস করা সবসময় কোনো বিরাট নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে ঘটে না। ধ্বংস অনেক সময় ঘটে খুব ধীরে। এত ধীরে যে একই জায়গায় বসবাসকারী মানুষ প্রতিদিন পরিবর্তনটি দেখেও বুঝতে পারে না।

মগড়ার দিকে তাকালে আমার সেই কথাই মনে হয়। সম্ভবত একটি নদীর মৃত্যুও এমনই।

আজ একটু ময়লা পড়ল। কাল আরেকটু। একটি নর্দমা এসে মিশল। কোথাও তীরের একটু অংশ দখল হলো। কোনো বছর নদী কিছুটা সংকুচিত হলো। তারপর আরেকটি স্থাপনা উঠল। দেখতে দেখতে একদিন মানুষ আবিষ্কার করে—যে নদীটি তার শৈশবে ছিল, সেটি আর নেই।

নদীকে বাঁচাতে হলে আগে তাকে মরতে দেওয়া বন্ধ করতে হবে

তখন আমরা নদী বাঁচানোর কর্মসূচি হাতে নিই। কিন্তু আমার একটি ব্যক্তিগত উপলব্ধি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে নদীকে আইনিভাবেও একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মগড়াকে প্রতিদিন দেখতে দেখতে আমার মনে হয়, নদী হয়তো আমাদের কাছে এত বেশি কিছু চায় না।

নদী চায় না আমরা প্রতিদিন তাকে গিয়ে উদ্ধার করি। নদী চায় না আমরা তাকে দয়া করি। প্রকৃতি নিজের নিয়মে নিজেকে টিকিয়ে রাখার অসাধারণ ক্ষমতা রাখে।

একটি নদীর প্রবাহ যদি আমরা বন্ধ না করি, তার তীর যদি নির্বিচারে দখল না করি, তার শরীরে যদি ময়লা-পয়োবর্জ্য ঢেলে না দিই, তবে নদী অনেকটাই নিজের যত্ন নিজেই নিতে পারে।

সমস্যা হলো, আমরা তাকে সেই সুযোগটুকুও দিচ্ছি না।

আমাদের নদীনির্ভরতার মধ্যেই যেন এক ধরনের নির্মম বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। নদীর কাছে আমরা পানি, মাছ, কৃষির সুবিধা, জমির মূল্য, ব্যবসার সুবিধা ও সুন্দর পরিবেশ—সবকিছু চাই। নদীর পাড়ে বাড়ি বানাই, দোকান বানাই, রাস্তা বানাই। নদীর উপস্থিতি ব্যবহার করে অর্থনীতি তৈরি করি। তারপর সেই নদীকেই সবচেয়ে সহজ বর্জ্য ফেলার জায়গা মনে করি।

আরও পড়ুনঃ  ২০৩০ সালে ৫৫০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্য, গ্রিডের বাইরে থাকবে সংসদ

মগড়ার দায় শুধু দখলদার বা দূষণকারীর নয়

শুধু মগড়া নয়, বাংলাদেশের বহু নদীর ক্ষেত্রেই এই চিত্র পরিচিত। নদীকে ব্যবহার করা এবং ব্যবহার করতে করতে তাকে নিঃশেষ করে ফেলা যেন আমাদের সমন্বিত সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

নদী ধ্বংসের দায় শুধু কোনো অদৃশ্য ‘দখলদার’ বা ‘দূষণকারী’র ওপর চাপিয়ে দিয়ে আমরা নিজেদের দায় শেষ করতে পারি না। নদীতীরবর্তী সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ—কেউই এই দায় থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়।

আমাদের দৈনন্দিন ছোট ছোট কাজও একটি নদীর ভাগ্য নির্ধারণ করে।

আরও ভয় পাই আরেকটি কারণে। আমরা শুধু নদী ধ্বংস করছি না; নদীর প্রতি আমাদের উদাসীনতাও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি।

একটি শিশু যদি জন্মের পর থেকে দেখে নদী মানেই ময়লা ফেলার জায়গা, নর্দমার শেষ ঠিকানা, দুর্গন্ধময় কালো পানি—তাহলে সে নদীকে ভালোবাসতে শিখবে কীভাবে?

নদী যে একটি জীবন্ত প্রতিবেশ, নদী যে মানুষের সভ্যতা গড়ে তোলে, নদী যে মানুষের অস্তিত্বের অংশ—এই অনুভূতিই যদি তার মধ্যে তৈরি না হয়, তবে ভবিষ্যতের নদীগুলো কে রক্ষা করবে?

প্রকৃতির প্রতি যত্নবান হওয়া কোনো সৌখিন পরিবেশবাদ নয়। এটি আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।

মগড়ার বর্তমান সংকট কী বলছে?

মগড়া নিয়ে কিছু সাম্প্রতিক তথ্যও আশঙ্কার কারণ দেখায়। সরকারি নথিতে নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১২ কিলোমিটার বলা হয়েছে। নেত্রকোণা সদর, পূর্বধলা, আটপাড়া ও মদন হয়ে নদীটি বৃহত্তর হাওর-নদীব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাঠভিত্তিক পর্যবেক্ষণেও মগড়ার সঙ্গে স্থানীয় বিল ও জলাভূমির গভীর সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।

গোবিন্দচাতল বিলসহ বিভিন্ন জলাভূমি মগড়ার পানির সঙ্গে যুক্ত। এসব বিলের ওপর আশপাশের বহু গ্রামের মানুষের কৃষি, মাছ ও জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল।

অর্থাৎ শহরের কোনো একটি স্থানে নদীতে ফেলা বর্জ্যের গল্প শুধু সেই জায়গাতেই শেষ হয়ে যায়—এমন নিশ্চয়তা নেই। এই কারণেই মগড়ার দূষণ শুধু সৌন্দর্যহানির প্রশ্ন নয়।

দরকার নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ

নদীর পানি কতটা দূষিত, কোন জায়গা থেকে নর্দমা ও বর্জ্যপানি সরাসরি নদীতে ঢুকছে, কয়েক দশকে নদীর প্রস্থ ও প্রবাহপথ কতটা বদলেছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ দরকার।

প্রয়োজন হলে পানির গুণমান পরীক্ষা করতে হবে। স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে নদীর পুরোনো ও বর্তমান প্রবাহপথ তুলনা করা যেতে পারে। কোথায় দখল হয়েছে, কোথায় স্বাভাবিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে—তাও নির্ণয় করা সম্ভব।

তবে গবেষণা করার জন্য গবেষণা নয়। তথ্য দরকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।

আদালতের নির্দেশের পরও দায়িত্ব শেষ নয়

২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল হাইকোর্ট মগড়াকে দখল ও দূষণ থেকে রক্ষায় নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখলদার ও দূষণকারীদের তালিকা প্রস্তুত এবং পৌর ও গৃহস্থালি পয়োবর্জ্য ও বর্জ্যপানি নদীতে ফেলা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

আরও পড়ুনঃ  বড় ভাই রাষ্ট্রপতি, গর্বে বুক ভরে যায়: ফয়সল আমিন

অর্থাৎ মগড়ার সংকট এখন শুধু স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ নয়; এটি আইন, প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বেরও বিষয়।

তারপরও শুধু আদালতের নির্দেশ বা প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে একটি নদীকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচানো কঠিন।

নদীকে পরিষ্কার করার চেয়ে নদীকে নোংরা না করা সহজ। দখল উচ্ছেদের চেয়ে দখল হতে না দেওয়া সহজ। প্রবাহপথ পুনরুদ্ধারের চেয়ে প্রবাহপথ অক্ষুণ্ন রাখা সহজ। এই সহজ সত্যগুলো আমরা সাধারণত খুব দেরিতে বুঝি।

মগড়াকে দেখতে হবে সমন্বিত জীবন্ত ব্যবস্থা হিসেবে

মগড়াকে তাই একটি বিচ্ছিন্ন নদী হিসেবে না দেখে নদী-নগর-খাল-বিল-হাওরের একটি সমন্বিত জীবন্ত ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।

পৌরসভার নর্দমা ও পয়োবর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়া বন্ধ করতে হবে। কঠিন বর্জ্যের কার্যকর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তীর রক্ষা করতে হবে।

প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষক, পরিবেশকর্মী এবং স্থানীয় মানুষ—সবাইকে একই নদীর পাশে দাঁড়াতে হবে।

তবে এর চেয়েও বড় কাজ সম্ভবত আরেকটি—নদীর প্রতি আমাদের মানসিক সম্পর্কটি বদলানো।

একদিন কি মগড়া শুধু পুরোনো ছবিতে থাকবে?

আমি প্রায় প্রতিদিন মগড়া পার হই। কোনো কোনো দিন রিকশায় বসে নদীটির দিকে তাকাই এবং ভাবি—এই নদী কি একশ বছর পরও থাকবে?

তখনও কি কোনো মানুষ এই শহরে এসে প্রথমবার মগড়াকে দেখে মুগ্ধ হবে? কোনো শিশু কি তার পাড়ে দাঁড়িয়ে মাছ দেখবে? বর্ষায় পানি বাড়লে কি আবার বিল ও জলাভূমিগুলো প্রাণ ফিরে পাবে?

নাকি ভবিষ্যতের কোনো মানুষ পুরোনো ছবি দেখে জানবে—একসময় এই শহরের ভেতর দিয়ে একটি নদী বয়ে যেত!

ডেভিড অ্যাটেনবোরো তার দীর্ঘ জীবনে বদলে যাওয়া পৃথিবীর সাক্ষ্য রেখে যাচ্ছেন। আমাদের প্রত্যেকের জীবনও আসলে তেমন একটি ছোট সাক্ষ্য।

আমরা প্রত্যেকে আমাদের সময়ের নদী, বন, মাঠ ও জলাভূমিকে বদলে যেতে দেখছি। প্রশ্ন হলো, আমরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কী সাক্ষ্য রেখে যেতে চাই?

আমরা কি বলব, আমাদের সামনে একটি নদী ধীরে ধীরে মরছিল এবং আমরা দেখেছি? নাকি বলব, একসময় আমরা বুঝতে পেরেছিলাম—নদীকে বাঁচানো মানে আসলে নিজেদেরই বাঁচানো?

মগড়া আমার কাছে এখন আর শুধু নেত্রকোণার একটি নদী নয়। প্রতিদিন নদীটি আমাকে একটি প্রশ্ন করে—মানুষ প্রকৃতির কাছ থেকে কত কিছু নিতে পারে, কিন্তু বিনিময়ে কতটুকু ফিরিয়ে দিতে শেখে?

হয়তো মগড়া কিংবা অন্য সব নদীকে আমাদের কিছু ফিরিয়েও দিতে হবে না। শুধু তাকে তার মতো করে বেঁচে থাকতে দিতে হবে।

ড. পারভীন জলী : অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ট্রেজারার, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়

T ag

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় পোস্ট

টিকাদানে ঘাটতিতে ভয়াবহ রূপ, বিশ্বের সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে

মগড়া নদী কি টিকে থাকবে, নাকি হারিয়ে যাবে মানুষের অবহেলায়?

আপডেটের সময়: ০৯:৩৪:১৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেজারার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় দুই বছর ধরে এই শহরের সঙ্গে আমার প্রতিদিনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। শহরটিকে চিনেছি তার রাস্তা, মানুষ, বাজার আর ঋতুর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। তবে সবচেয়ে বেশি চিনেছি মগড়া নদীকে দেখে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে প্রতিদিন অন্তত দুবার আমাকে মগড়া পার হতে হয়। কখনো রিকশায়, কখনো গাড়িতে। এতবার একটি নদী পার হতে হতে একসময় নদীটি আর শুধু পথের পাশের কোনো দৃশ্য থাকে না; অজান্তেই সে দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে যায়। দিনের আলো বদলের সঙ্গে তার রং বদলাতে দেখি। বর্ষায় তাকে দেখি একভাবে, শুষ্ক মৌসুমে আরেকভাবে।

কখনো রিকশা থেকে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি, কখনো ব্যস্ততার মধ্যে শুধু একঝলক চোখ পড়ে। কিন্তু এই নিয়মিত দেখার মধ্যেই ধীরে ধীরে একটি অস্বস্তি জন্মেছে। দেখেছি, একটি নদী কীভাবে মানুষের হাতেই একটু একটু করে আহত হয়।

নদীর কাছ থেকে সবকিছু চাই, ফিরিয়ে দিই বর্জ্য

যে নদীর তীরে মানুষ ঘর বানিয়েছে, দোকান বানিয়েছে, ব্যবসাকেন্দ্র গড়ে তুলেছে, যে নদীর উপস্থিতি একটি শহরকে বসবাসযোগ্য করেছে, সেই নদীর দিকেই আমরা অবলীলায় ছুড়ে দিচ্ছি আমাদের বর্জ্য।

নর্দমার পানি গিয়ে পড়ছে নদীতে। কোথাও ময়লা জমছে, কোথাও তীর সংকুচিত হচ্ছে। নদীকে প্রতিদিন ব্যবহার করছি, কিন্তু নদীর প্রতিও যে আমাদের কোনো দায় আছে—সেই কথাটি যেন ক্রমেই ভুলে যাচ্ছি।

মগড়া অন্য অনেক নদীর মতো নয়। নেত্রকোণায় এসে নদীটির সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য মনে হয়েছে তার চলার ভঙ্গি। সাপের মতো এঁকেবেঁকে সে এই অঞ্চল দিয়ে বয়ে গেছে। নেত্রকোণা শহরটিকেও সে যেন একবার ছুঁয়ে চলে যায়নি; ঘুরে-পেঁচিয়ে বারবার শহরের কাছে ফিরে এসেছে।

কোথাও রাস্তার পাশে, কোথাও বসতির গা ঘেঁষে, কোথাও বাজারের কাছে—মগড়া যেন শহরের শরীরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত একটি শিরা। সম্ভবত সে কারণেই নেত্রকোণার দৈনন্দিন জীবন থেকে মগড়াকে আলাদা করে ভাবা কঠিন।

শুধু একটি নদী নয়, বড় জলপ্রবাহ ব্যবস্থার অংশ

এ অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস, জীবিকা, কৃষি, মাছ ও জলাভূমির সঙ্গে নদীটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মগড়া শুধু নেত্রকোণা শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি জলধারা নয়। নদীটি আটপাড়ার কৃষিভূমি, আশপাশের খাল-বিল এবং বৃহত্তর হাওর অঞ্চলের জলপ্রবাহের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বর্ষা এলে নদী, খাল, বিল ও প্লাবনভূমি আলাদা আলাদা ভূখণ্ড থাকে না। পানি তাদের একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে। মাছ চলাচল করে, পলি যায়, জলজ উদ্ভিদ ছড়িয়ে পড়ে, কৃষিজমি পানি পায়। প্রকৃতির এই সম্পর্কগুলো খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু অত্যন্ত গভীর।

আমরা শহরে বসে কখনো কখনো একটি নদীকে শুধু তার দৃশ্যমান অংশ দিয়ে বিচার করি। মনে করি, আমার বাড়ির পাশ দিয়ে যে অংশটুকু গেছে, সেটুকুই নদী। কিন্তু নদীর জীবন আমাদের চোখে দেখা সীমানার চেয়ে অনেক বড়।

আরও পড়ুনঃ  ২০৩০ সালে ৫৫০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্য, গ্রিডের বাইরে থাকবে সংসদ

মগড়ার পানি খাল দিয়ে বিলে যায়, প্লাবনভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে, আবার পানি কমলে সেই জল বৃহত্তর নদীব্যবস্থায় ফিরে আসে। অর্থাৎ মগড়াকে আঘাত করলে তার প্রভাব শুধু শহরের কয়েক কিলোমিটার নদীতে সীমাবদ্ধ থাকে না।

নদীর মৃত্যুও ঘটে ধীরে ধীরে

কিছুদিন আগে বিখ্যাত প্রকৃতিবিদ ও প্রাকৃতিক ইতিহাসের লেখক ডেভিড অ্যাটেনবোরোর A Life on Our Planet দেখছিলাম। ডকুমেন্টারিটিকে তিনি নিজের ‘witness statement’ বা সাক্ষ্য হিসেবে নির্মাণ করেছেন।

প্রায় এক শতাব্দীর জীবনে তিনি পৃথিবীর যে রূপ দেখেছেন এবং মানুষের কর্মকাণ্ডে সেই পৃথিবীকে যেভাবে বদলে যেতে দেখেছেন, তারই এক গভীর ব্যক্তিগত বিবরণ এটি।

অ্যাটেনবোরো যখন তার যৌবনের পৃথিবীর কথা বলেন—অরণ্যের বিস্তার, প্রাণবৈচিত্র্যের প্রাচুর্য, প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য—তারপর দেখান কয়েক দশকের মধ্যেই মানুষ কী দ্রুত সেই পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে, তখন একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে আসে।

পৃথিবীকে ধ্বংস করা সবসময় কোনো বিরাট নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে ঘটে না। ধ্বংস অনেক সময় ঘটে খুব ধীরে। এত ধীরে যে একই জায়গায় বসবাসকারী মানুষ প্রতিদিন পরিবর্তনটি দেখেও বুঝতে পারে না।

মগড়ার দিকে তাকালে আমার সেই কথাই মনে হয়। সম্ভবত একটি নদীর মৃত্যুও এমনই।

আজ একটু ময়লা পড়ল। কাল আরেকটু। একটি নর্দমা এসে মিশল। কোথাও তীরের একটু অংশ দখল হলো। কোনো বছর নদী কিছুটা সংকুচিত হলো। তারপর আরেকটি স্থাপনা উঠল। দেখতে দেখতে একদিন মানুষ আবিষ্কার করে—যে নদীটি তার শৈশবে ছিল, সেটি আর নেই।

নদীকে বাঁচাতে হলে আগে তাকে মরতে দেওয়া বন্ধ করতে হবে

তখন আমরা নদী বাঁচানোর কর্মসূচি হাতে নিই। কিন্তু আমার একটি ব্যক্তিগত উপলব্ধি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে নদীকে আইনিভাবেও একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মগড়াকে প্রতিদিন দেখতে দেখতে আমার মনে হয়, নদী হয়তো আমাদের কাছে এত বেশি কিছু চায় না।

নদী চায় না আমরা প্রতিদিন তাকে গিয়ে উদ্ধার করি। নদী চায় না আমরা তাকে দয়া করি। প্রকৃতি নিজের নিয়মে নিজেকে টিকিয়ে রাখার অসাধারণ ক্ষমতা রাখে।

একটি নদীর প্রবাহ যদি আমরা বন্ধ না করি, তার তীর যদি নির্বিচারে দখল না করি, তার শরীরে যদি ময়লা-পয়োবর্জ্য ঢেলে না দিই, তবে নদী অনেকটাই নিজের যত্ন নিজেই নিতে পারে।

সমস্যা হলো, আমরা তাকে সেই সুযোগটুকুও দিচ্ছি না।

আমাদের নদীনির্ভরতার মধ্যেই যেন এক ধরনের নির্মম বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। নদীর কাছে আমরা পানি, মাছ, কৃষির সুবিধা, জমির মূল্য, ব্যবসার সুবিধা ও সুন্দর পরিবেশ—সবকিছু চাই। নদীর পাড়ে বাড়ি বানাই, দোকান বানাই, রাস্তা বানাই। নদীর উপস্থিতি ব্যবহার করে অর্থনীতি তৈরি করি। তারপর সেই নদীকেই সবচেয়ে সহজ বর্জ্য ফেলার জায়গা মনে করি।

আরও পড়ুনঃ  রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর প্রথমবার ঠাকুরগাঁও সফরে মির্জা ফখরুল

মগড়ার দায় শুধু দখলদার বা দূষণকারীর নয়

শুধু মগড়া নয়, বাংলাদেশের বহু নদীর ক্ষেত্রেই এই চিত্র পরিচিত। নদীকে ব্যবহার করা এবং ব্যবহার করতে করতে তাকে নিঃশেষ করে ফেলা যেন আমাদের সমন্বিত সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

নদী ধ্বংসের দায় শুধু কোনো অদৃশ্য ‘দখলদার’ বা ‘দূষণকারী’র ওপর চাপিয়ে দিয়ে আমরা নিজেদের দায় শেষ করতে পারি না। নদীতীরবর্তী সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ—কেউই এই দায় থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়।

আমাদের দৈনন্দিন ছোট ছোট কাজও একটি নদীর ভাগ্য নির্ধারণ করে।

আরও ভয় পাই আরেকটি কারণে। আমরা শুধু নদী ধ্বংস করছি না; নদীর প্রতি আমাদের উদাসীনতাও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি।

একটি শিশু যদি জন্মের পর থেকে দেখে নদী মানেই ময়লা ফেলার জায়গা, নর্দমার শেষ ঠিকানা, দুর্গন্ধময় কালো পানি—তাহলে সে নদীকে ভালোবাসতে শিখবে কীভাবে?

নদী যে একটি জীবন্ত প্রতিবেশ, নদী যে মানুষের সভ্যতা গড়ে তোলে, নদী যে মানুষের অস্তিত্বের অংশ—এই অনুভূতিই যদি তার মধ্যে তৈরি না হয়, তবে ভবিষ্যতের নদীগুলো কে রক্ষা করবে?

প্রকৃতির প্রতি যত্নবান হওয়া কোনো সৌখিন পরিবেশবাদ নয়। এটি আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।

মগড়ার বর্তমান সংকট কী বলছে?

মগড়া নিয়ে কিছু সাম্প্রতিক তথ্যও আশঙ্কার কারণ দেখায়। সরকারি নথিতে নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১২ কিলোমিটার বলা হয়েছে। নেত্রকোণা সদর, পূর্বধলা, আটপাড়া ও মদন হয়ে নদীটি বৃহত্তর হাওর-নদীব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাঠভিত্তিক পর্যবেক্ষণেও মগড়ার সঙ্গে স্থানীয় বিল ও জলাভূমির গভীর সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।

গোবিন্দচাতল বিলসহ বিভিন্ন জলাভূমি মগড়ার পানির সঙ্গে যুক্ত। এসব বিলের ওপর আশপাশের বহু গ্রামের মানুষের কৃষি, মাছ ও জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল।

অর্থাৎ শহরের কোনো একটি স্থানে নদীতে ফেলা বর্জ্যের গল্প শুধু সেই জায়গাতেই শেষ হয়ে যায়—এমন নিশ্চয়তা নেই। এই কারণেই মগড়ার দূষণ শুধু সৌন্দর্যহানির প্রশ্ন নয়।

দরকার নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ

নদীর পানি কতটা দূষিত, কোন জায়গা থেকে নর্দমা ও বর্জ্যপানি সরাসরি নদীতে ঢুকছে, কয়েক দশকে নদীর প্রস্থ ও প্রবাহপথ কতটা বদলেছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ দরকার।

প্রয়োজন হলে পানির গুণমান পরীক্ষা করতে হবে। স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে নদীর পুরোনো ও বর্তমান প্রবাহপথ তুলনা করা যেতে পারে। কোথায় দখল হয়েছে, কোথায় স্বাভাবিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে—তাও নির্ণয় করা সম্ভব।

তবে গবেষণা করার জন্য গবেষণা নয়। তথ্য দরকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।

আদালতের নির্দেশের পরও দায়িত্ব শেষ নয়

২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল হাইকোর্ট মগড়াকে দখল ও দূষণ থেকে রক্ষায় নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখলদার ও দূষণকারীদের তালিকা প্রস্তুত এবং পৌর ও গৃহস্থালি পয়োবর্জ্য ও বর্জ্যপানি নদীতে ফেলা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

আরও পড়ুনঃ  লিড নিয়েও মোনাকোর কাছে হার, তিন ম্যাচে জয়হীন পিএসজি

অর্থাৎ মগড়ার সংকট এখন শুধু স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ নয়; এটি আইন, প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বেরও বিষয়।

তারপরও শুধু আদালতের নির্দেশ বা প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে একটি নদীকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচানো কঠিন।

নদীকে পরিষ্কার করার চেয়ে নদীকে নোংরা না করা সহজ। দখল উচ্ছেদের চেয়ে দখল হতে না দেওয়া সহজ। প্রবাহপথ পুনরুদ্ধারের চেয়ে প্রবাহপথ অক্ষুণ্ন রাখা সহজ। এই সহজ সত্যগুলো আমরা সাধারণত খুব দেরিতে বুঝি।

মগড়াকে দেখতে হবে সমন্বিত জীবন্ত ব্যবস্থা হিসেবে

মগড়াকে তাই একটি বিচ্ছিন্ন নদী হিসেবে না দেখে নদী-নগর-খাল-বিল-হাওরের একটি সমন্বিত জীবন্ত ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।

পৌরসভার নর্দমা ও পয়োবর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়া বন্ধ করতে হবে। কঠিন বর্জ্যের কার্যকর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তীর রক্ষা করতে হবে।

প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষক, পরিবেশকর্মী এবং স্থানীয় মানুষ—সবাইকে একই নদীর পাশে দাঁড়াতে হবে।

তবে এর চেয়েও বড় কাজ সম্ভবত আরেকটি—নদীর প্রতি আমাদের মানসিক সম্পর্কটি বদলানো।

একদিন কি মগড়া শুধু পুরোনো ছবিতে থাকবে?

আমি প্রায় প্রতিদিন মগড়া পার হই। কোনো কোনো দিন রিকশায় বসে নদীটির দিকে তাকাই এবং ভাবি—এই নদী কি একশ বছর পরও থাকবে?

তখনও কি কোনো মানুষ এই শহরে এসে প্রথমবার মগড়াকে দেখে মুগ্ধ হবে? কোনো শিশু কি তার পাড়ে দাঁড়িয়ে মাছ দেখবে? বর্ষায় পানি বাড়লে কি আবার বিল ও জলাভূমিগুলো প্রাণ ফিরে পাবে?

নাকি ভবিষ্যতের কোনো মানুষ পুরোনো ছবি দেখে জানবে—একসময় এই শহরের ভেতর দিয়ে একটি নদী বয়ে যেত!

ডেভিড অ্যাটেনবোরো তার দীর্ঘ জীবনে বদলে যাওয়া পৃথিবীর সাক্ষ্য রেখে যাচ্ছেন। আমাদের প্রত্যেকের জীবনও আসলে তেমন একটি ছোট সাক্ষ্য।

আমরা প্রত্যেকে আমাদের সময়ের নদী, বন, মাঠ ও জলাভূমিকে বদলে যেতে দেখছি। প্রশ্ন হলো, আমরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কী সাক্ষ্য রেখে যেতে চাই?

আমরা কি বলব, আমাদের সামনে একটি নদী ধীরে ধীরে মরছিল এবং আমরা দেখেছি? নাকি বলব, একসময় আমরা বুঝতে পেরেছিলাম—নদীকে বাঁচানো মানে আসলে নিজেদেরই বাঁচানো?

মগড়া আমার কাছে এখন আর শুধু নেত্রকোণার একটি নদী নয়। প্রতিদিন নদীটি আমাকে একটি প্রশ্ন করে—মানুষ প্রকৃতির কাছ থেকে কত কিছু নিতে পারে, কিন্তু বিনিময়ে কতটুকু ফিরিয়ে দিতে শেখে?

হয়তো মগড়া কিংবা অন্য সব নদীকে আমাদের কিছু ফিরিয়েও দিতে হবে না। শুধু তাকে তার মতো করে বেঁচে থাকতে দিতে হবে।

ড. পারভীন জলী : অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ট্রেজারার, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়