বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সময়ের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে আনা জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের ওপর বক্তব্যে তিনি এসব তথ্য জানান। সংরক্ষিত আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার ও উৎপাদন বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে নোটিশটি আনেন।
২০৩০ সালে বিদ্যুতের চাহিদা ২৫ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। এ চাহিদা বিবেচনায় আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, ২০৩০ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং বায়ু, বর্জ্য, পানি বিদ্যুৎ, ভাসমান সৌর ও এগ্রিভোলটাইকসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে কর সুবিধা
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানিতে কর সুবিধা দেওয়ার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও স্ট্রাকচারসহ প্রয়োজনীয় পণ্যে মাত্র ১ শতাংশ কর নির্ধারণ করা হয়েছে।
ক্ষুদ্র আমদানিকারকদেরও এ খাতে যুক্ত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানিতে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের আগামী ছয় মাসের জন্য কর ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে ১৮০ দিন পর্যন্ত আমদানি করা যন্ত্রপাতিতে ১ শতাংশের অতিরিক্ত কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, মূল্যসংযোজন কর, আগাম কর ও প্রগ্রেসিভ আয়কর থেকে পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হবে।
উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ কিনবে সরকার
আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করবেন এবং নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন, সরকার তাদের কাছ থেকে আকর্ষণীয় মূল্যে বিদ্যুৎ কিনবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
এ ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা।
তিনি আরও জানান, সরকারি সংস্থার মালিকানাধীন জমিতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প উন্নয়ন নির্দেশিকা-২০২৬ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি অংশগ্রহণ বিধিমালা-২০২৫ জারি করা হয়েছে।
এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০২৫, নেট মিটারিং গাইডলাইন-২০২৫, জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি-২০২৫ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবসায়িক মডেল চূড়ান্ত করা হয়েছে।
রামপাল ও মাতারবাড়ীতে সৌর প্রকল্প
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে আরেকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও স্থানীয় মানুষের আবেগকে সম্মান জানিয়ে সেখানে কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এর অংশ হিসেবে রামপালে ৪৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মাতারবাড়ী কোল পাওয়ার প্রকল্পের অ্যাশ পয়েন্টের জন্য নির্ধারিত জায়গায় ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আরেকটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সংসদ ভবনেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা
প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর ফেনীতে বিভিন্ন সামাজিক সুবিধার কার্ড বিতরণ কর্মসূচি রয়েছে। এ উপলক্ষে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ২৩টি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বিদ্যুৎ বিভাগও এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর এসব প্রকল্প উদ্বোধন করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংসদ ভবনের বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগামী দিনে জাতীয় সংসদের সব কার্যক্রমে জাতীয় গ্রিড থেকে কোনো বিদ্যুৎ গ্রহণ করা হবে না। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে সংসদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণের ফলে একদিকে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হওয়া বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তরুণ ও যুব সমাজের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সৌরবিদ্যুৎ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ খাতের উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
৬০ হাজার একর জমির তালিকা, চিহ্নিত প্রায় ৩০০ একর
সম্পূরক প্রশ্নে হেলেন জেরিন খান রুফটপ সোলারের জন্য কোনো মানচিত্র প্রকাশের পরিকল্পনা আছে কি না এবং নদীর ওপর সৌর প্যানেল স্থাপনের কোনো উদ্যোগ রয়েছে কি না জানতে চান।
জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বড় সৌর প্রকল্পের জন্য পিপিপি পদ্ধতিতে সরকার জমি দেবে। বিনিয়োগকারীদের নিজেদের জমি কিনতে হলে প্রকল্পের বিনিয়োগ ও বিদ্যুতের মূল্য দুটোই বাড়বে।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে তাদের পতিত জমি এবং আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরেও ব্যবহারের সম্ভাবনা কম—এমন জমির তালিকা দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সব মন্ত্রণালয় মিলে প্রায় ৬০ হাজার একর জমির প্রতিবেদন দিয়েছে। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই করে প্রায় ৩০০ একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে।
এসব জমি ইনভেস্ট বাংলাদেশের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হবে। সরকার জমি দেবে, আর বিনিয়োগকারীরা সেখানে অর্থ ও প্রযুক্তি নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন। জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
রুফটপ সোলারের আলাদা মানচিত্র তৈরির উদ্যোগ নেই
রুফটপ সোলারের জন্য আলাদা কোনো মানচিত্র প্রকাশের উদ্যোগ এখনো নেই বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সব সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিনিয়োগকারীরা যাতে এগিয়ে আসতে পারেন, সে জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রতিবেদকের নাম 




















