বিশ্ববাজারে আগামী দুই বছরের মধ্যে স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন কয়েকজন বিনিয়োগকারী ও তহবিল ব্যবস্থাপক। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সরকারি ঋণ বৃদ্ধি এবং মার্কিন ডলারের ওপর আস্থার সংকটের কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম ওঠানামার মধ্যেই বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা কেনার পরিমাণ বেড়েছে। বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিলের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার পরিমাণ প্রায় ৬৩ টনে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর কোনো এক মাসে এটি ছিল সর্বোচ্চ কেনাকাটা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার বিশ্ববাজারে প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ২ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৭৫ ডলারে নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ আবার সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন প্রত্যাশার প্রভাব পড়েছে দামে। তবে কয়েকজন তহবিল ব্যবস্থাপকের ধারণা, সাম্প্রতিক দরপতনের পর স্বর্ণের দাম আবারও বাড়তে পারে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৫০০ ডলারের বেশি উঠে সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়েছিল। এরপর দাম কমলেও ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে মূল্যবান এই ধাতুর দাম।
১২ থেকে ১৮ মাসে নতুন রেকর্ডের পূর্বাভাস
ট্রয় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের তহবিল ব্যবস্থাপক শার্লট ইয়ং মনে করেন, আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।
তাঁর মতে, সরকারি অর্থব্যবস্থার অবনতিশীল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে স্বর্ণ কার্যকর সুরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নতুন করে অর্থ সরবরাহ বাড়াতে পারে। কিন্তু কাগুজে মুদ্রার মতো স্বর্ণ ইচ্ছামতো তৈরি করা সম্ভব নয়।
অয়ন ইনভেস্টমেন্টসের ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের প্রতিনিধি প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা পল কার্নও আগামী দুই বছরের মধ্যে স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ডে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দিয়েছেন।
তাঁর মতে, ডলারকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে বিভিন্ন দেশ ও বিনিয়োগকারী বিকল্প সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন। সে ক্ষেত্রে স্বর্ণ গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
ডলারের ওপর আস্থা কমলে বাড়তে পারে চাহিদা
স্বর্ণখনি প্রতিষ্ঠান অ্যালায়েড গোল্ডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী পিটার মারোনে মনে করেন, বিশ্ব নতুন কোনো আর্থিক সংকটের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে কি না, তা বিনিয়োগকারীদের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
তাঁর ভাষ্য, বিশ্ব অর্থনীতি বড় কোনো আর্থিক ঘটনার দ্বারপ্রান্তে থাকতে পারে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় কিছু পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সরকারি বন্ড থেকে অর্থ সরিয়ে স্বর্ণে বিনিয়োগ করছে।
স্বর্ণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এন্ডেভার মাইনিংয়ের প্রধান নির্বাহী ইয়ান ককারিল বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রচলিত মুদ্রার ওপর আস্থা কমে যাওয়া এবং নিজস্ব মুদ্রার মূল্য রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর উদ্বেগ স্বর্ণের দামের পক্ষে কাজ করছে।
তবে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ডলারকে সর্বনিম্ন সীমা হিসেবে ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিশ্চিত নয় বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ধারণা, পরবর্তী ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার আগে স্বর্ণের দাম এ স্তরের কাছাকাছি থাকতে পারে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পণ্যবাজারবিষয়ক গবেষণা বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান সুকি কুপার বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণের চাহিদা এখনো শক্তিশালী। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর কিছু দেশ অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজনে স্বর্ণ বিক্রিও করেছে।
শার্লট ইয়ংয়ের মতে, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মার্কিন ডলারের বিকল্প রিজার্ভ সম্পদ খুঁজছে। এ ক্ষেত্রে ইউরো বা ইয়েনের তুলনায় স্বর্ণের প্রতি তাদের আগ্রহ বেশি হতে পারে।
চীনের স্বর্ণের মজুত ২ হাজার ৪১০ টন
বিশ্লেষকদের ধারণা, মার্কিন ডলারের ওপর আস্থা কমে গেলে এবং বিকল্প সম্পদের চাহিদা বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আবারও স্বর্ণ কেনার পরিমাণ বাড়াতে পারে।
বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়না সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও স্বর্ণের মজুত বাড়িয়েছে। দেশটির মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ এখন প্রায় ৯ শতাংশ। পরিমাণের হিসাবে চীনের স্বর্ণের মজুত প্রায় ২ হাজার ৪১০ টন।
সব মিলিয়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরকারি ঋণ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ডলারের বিকল্প সম্পদের চাহিদা আগামী দুই বছরে স্বর্ণের বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে এসব পূর্বাভাস নিশ্চিত নয়; সুদের হার, মুদ্রাবাজারের গতিপ্রকৃতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সিদ্ধান্তের ওপরও স্বর্ণের দামের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।
প্রতিবেদকের নাম 



















