
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সন্তান রুমীকে হারানোর বেদনা বুকে ধারণ করে ব্যক্তিগত শোককে জাতীয় আন্দোলনে রূপ দিয়েছিলেন যিনি, সেই শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আজ (২৬ জুন) ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আপসহীন সংগ্রামের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
১৯২৯ সালের ৩ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জাহানারা ইমাম। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘জুড়ূ’। বাবা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং মা সৈয়দা হামিদা বেগম।
বাবার কর্মস্থল পরিবর্তনের কারণে শৈশবে তৎকালীন পূর্ববাংলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করার সুযোগ পান তিনি। ১৯৪৫ সালে কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষকতা দিয়েই তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তীতে সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ও ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর দেশে ফিরে আবারও শিক্ষকতায় যুক্ত হন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটেও খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনে নিয়ে আসে গভীর শোকের অধ্যায়। বড় ছেলে শহীদুল ইসলাম রুমী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে শহীদ হন। একই সময়ে অসুস্থ স্বামী প্রকৌশলী শরীফ ইমামও মৃত্যুবরণ করেন। স্বাধীনতার পর রুমীর সহযোদ্ধারা তাঁকে সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে সম্মান জানান। এরপর থেকেই তিনি ‘শহীদ জননী’ নামে সমগ্র জাতির কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময়কার দিনলিপির ভিত্তিতে রচিত তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ একাত্তরের দিনগুলি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে অন্য জীবন, বীরশ্রেষ্ঠ, জীবন মৃত্যু, বুকের ভিতরে আগুন, নাটকের অবসান, দুই মেরু, নিঃসঙ্গ পাইন, ক্যানসারের সঙ্গে বসবাস এবং প্রবাসের দিনলিপি।
স্বাধীনতার পর দেশে যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসনের প্রতিবাদে ১৯৯২ সালে তিনি ‘একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’র আহ্বায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত গণআদালত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিকে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করে।
জীবনের শেষ সময়ে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন জাহানারা ইমাম। পরে তাঁর মরদেহ দেশে এনে ঢাকায় দাফন করা হয়।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকীতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে নানা কর্মসূচি পালন করছে।
প্রতিবেদকের নাম 




















