চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা ফিরে এসেছে। এদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজের পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
সম্প্রতি কুমিল্লায় নিখোঁজের পর ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসে। চলতি বছর নিখোঁজ শিশুদের কারও মরদেহ মাটিচাপা অবস্থায়, আবার কারও মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার হয়েছে।
আট মাসে নিহত ১৫৫ শিশু
আসক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের তথ্যের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান তৈরি করে। তাদের হিসাবে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত শিশু নিখোঁজের পর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অন্যান্য ঘটনায় মোট ১৫৫ শিশু নিহত হয়েছে।
এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে ৬৮, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে ৪৯ এবং ধর্ষণের পর ২৬ শিশু নিহত হয়েছে। এ ছাড়া ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা ৪, গুলিতে নিহত ৩, গৃহকর্মীকে শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু ২, উত্ত্যক্তকারীর হাতে হত্যা ২ এবং অপহরণের পর হত্যার ঘটনা রয়েছে ১টি।
এর বাইরে আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিহত শিশুরাও
সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত চারটি ঘটনায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সাত শিশু নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি ভাড়া বাসায় এক পরিবারের মা ও তিন মেয়েকে হত্যা করা হয়। তিন মেয়ের মধ্যে সিপার বয়স ১০ বছর, ইকরার ১৭ বছর এবং সাইমা আক্তারের বয়স ২১ বছর।
আগস্টে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে ১২ বছরের ছেলে আয়ুশও নিহত হয়। একই মাসে মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর নদী থেকে তার এক বছরের সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ছাড়া সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ১৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছরের তিন শিশু নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
আট মাসে ২ হাজার ৩৬২ হত্যা মামলা
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা হয়েছে। অর্থাৎ আট মাসে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৯৫টি হত্যা মামলা হয়েছে।
গত ২২ মে বাংলাদেশে শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দেয় ইউনিসেফ। সংস্থাটির তৎকালীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এসব ঘটনায় দায়মুক্তির অবসানের আহ্বান জানান। ঘর, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রতিটি পরিসরে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ইউনিসেফ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় সুরক্ষা সেবা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তার ঘাটতি দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করে। একই সঙ্গে স্কুল, মাদ্রাসা ও কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহি বাড়ানোর কথাও তুলে ধরে সংস্থাটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, শিশুদের বিরুদ্ধে এ ধরনের সহিংসতা একটি সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শিশুদের নিরাপদ জায়গা আসলে কোথায়—এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। খেলার মাঠ, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যাওয়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে থাকলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শিশুর ওপর সহিংসতার পেছনে অপরাধীদের বিকৃত মানসিকতার পাশাপাশি প্রতিশোধ বা পারিবারিক বিরোধও ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানান তিনি। তার মতে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড়দের বিরোধ বা হিংসার শিকার হচ্ছে শিশুরা। এসব ঘটনার দ্রুত বিচার হলে সচেতনতা বাড়ার পাশাপাশি এ ধরনের অপরাধ কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিবেদকের নাম 

























